মাসুদ রানা পলক, ঠাকুরগাঁও: ঠাকুরগাঁওয়ে সরকারি মোবাইল অপারেটর কোম্পানি টেলিটকের বিক্রয় প্রতিনিধির বিরুদ্ধে দুই শতাধিক নারী-পুরুষের আঙ্গুলের ছাপ কপি করে সিম তুলে অন্যত্র বিক্রয়ের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযুক্ত জুয়েল রানা সদর উপজেলার রহিমানপুর ইউনিয়নের ফকদনপুর মোজতপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিলের (বাচ্চু) ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে টেলিটকের সিম বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে আসছিলেন।

স্থানীয়রা জানান, চলতি বছরের শুরুতে মোজতপাড়াসহ পাশের ইলিপাড়া, গুলপাড়া ও হঠাৎপাড়া গ্রামের দুই শতাধিক নারী-পুরুষকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক বার আইডি কার্ডের কপি ও আঙুলের ছাপ নেন জুয়েল। কোন গ্রাহককে একটি সিম আবার কোন গ্রাহকে সিম না দিয়ে তাদের অজান্তে প্রতিজনের নামে ৪/৫ অথবা ৮টি সিম তুলে অন্যত্র বিক্রয় করেন তিনি।

ভুক্তভোগিরা জানান, গত ১০ অক্টোবর জুয়েল রানার প্রতিবেশি মৃত খোকার স্ত্রী সফুরা বেওয়ার ব্যবহৃত সিমটি ব্লক হয়ে যায়। পরে সফুরা নিজের আইডি কার্ডসহ ছেলে রাফিককে নতুন সিম তোলার জন্য টেলিটক কাস্টমার সার্ভিস সেন্টারে পাঠান। সেখানে রাফিক জানতে পারেন তার মায়ের নামে ৮টি সিম তোলা হয়েছে।

সফুরা বেওয়ার ছেলে রাফিক বলেন, কাস্টমার সার্ভিস সেন্টার থেকে কথা শুনে মায়ের প্রতি খুব রাগ হচ্ছিলো। বাড়িতে এসে মায়ের কথা শুনে মনে হয় জুয়েল কিছু একটা করেছে। পরে জুয়েলকে বললে সে স্বীকার করে যে আমার মায়ের নামে সিম তুলে অন্যত্র বিক্রয় করেছে। পরে ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে জুয়েলের কাছে যারা আঙ্গুলের ছাপ দিয়েছিল তারা সবাই মোবাইলে এসএমএস দিয়ে নিশ্চিত হয় তাদের নামেও একাধিক সিম চালু আছে।

ফকদনপুর গ্রামের মৃত ওয়াহেদ আলীর ছেলে মোতালেব বলেন, জুয়েল আমাকে বলেছে বয়স্ক ভাতা হবে, সরকারি টাকা পাবো, তাই টেলিটকের সিম নিতে হবে। এই বলে আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে আমার নামেও তিনটি সিম তুলে বিক্রয় করেছে জুয়েল। এমনকি তিনবার আমার মানসিক ভারসাম্যহীন বোন হালিমারও আঙুলের ছাপ নিয়ে গেছে জুয়েল রানা।

ইলিপাড়া গ্রামের শেফালী, বেলাল, লাকী, রুবী, আলেয়া বলেন, আমাদের নামে থাকা টেলিটকের একাধিক সিম জুয়েলের মাধ্যমে অন্যজন ব্যবহার করছেন। আমরা না বুঝে জুয়েলকে আইডি কার্ডের কপি ও আঙ্গুলের ছাপ দিয়েছি। জুয়েল জালিয়াতির শিকার আমারা সবাই বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করেছি।

এদিকে ভুক্তভোগী অনেকেই রহিমানপুর ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান হান্নুর কাছে গিয়ে জুয়েলের শাস্থি দাবি জানান। পরে ইউনিয়ন পরিষদে হাজির হয়ে নিজের দোষ স্বীকার করেন জুয়েল। এছাড়াও ৪৫ দিনের মধ্যে সকল সিম বন্ধ ও চলতি সিম ব্যবহার করে কোন অন্যায় হলে তার দ্বায় নেওয়ার অঙ্গিকার করেন।

চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান হান্নু বলেন, গত ১৭ অক্টোবর পরিষদে শালিস বসলে জুয়েল এলাকার কিছু মানুষকে না জানিয়ে তাদের নামে একাধিক সিম তোলার কথা স্বীকার করে এবং সিম বন্ধের জন্য ৪৫ দিন সময় নেয়।

এছাড়াও গত ২৩ অক্টোবর বিচার চেয়ে জালিয়াতির শিকার ৮২ জনের স্বাক্ষরিত একটি দরখাস্থ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে দেওয়া হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, সিম জালিয়াতির ঘটনায় ৮২ জনের স্বাক্ষরিত একটি আবেদন পেয়েছি। তদন্তের জন্য সেটি পুলিশ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। তদন্তের পর দোষিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান বলেন, সিম জালিয়াতির আবেদনটি পেয়েছি। দ্রুত তদন্ত শুরু করা হবে। পরে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে জুয়েলের রানার মোবাইলে বার বার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে তার বাবা আব্দুল জলিল বলেন, জুয়েল কয়েক জনের নামে টেলিটকের কিছু সিম তুলেছে। চেয়ারম্যান মিমাংসা করে দিয়েছেন। ৪৫ দিনের মধ্যে সিমগুলো বন্ধ করতে হবে। ইতোমধ্যে কিছু সিম বন্ধ হয়েছে, বাকিগুলো বন্ধ করার কাজ চলছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য