লালমনিরহাট বিমানবন্দর এখন কৃষি খামারআজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট প্রতিনিধি: দেশের অতি পুরনো লালমনিরহাট বিমানবন্দর পাঁচ যুগ ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এ বিমানবন্দরটি কৃষি খামারে পরিণত হয়েছে।

অথচ বিমানবন্দরটি চালু হলে রংপুর অঞ্চলে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটার সম্ভাবনা আছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি এই বিমানবন্দরটি প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনোরকম সংস্কার ছাড়াই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

স্থানীয়রা মনে করেন, লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি চালু হলে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটবে। সুযোগ তৈরি হবে নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্যের। যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।

ভারতের সেভেন সিস্টার হিসেবে পরিচিত সাত রাজ্যসহ আশপাশের আরও কয়েকটি রাজ্য, নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ তৈরির একটা অন্যতম মাধ্যম হতে পারে লালমনিরহাট বিমানবন্দর।

এটিকে সংস্কারের মাধ্যমে নতুন করে চালু করা হলে এই অঞ্চলের চেহারাই পাল্টে যেতে পারে। বিমানবন্দরটি চালু হলে ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সব শ্রেণির মানুষ অনায়াসে কম খরচে বাংলাদেশে আসতে পারবে। একইভাবে বাংলাদেশিরাও ভারত, নেপাল ও ভুটানে অল্প খরচে গিয়ে সব কাজ করতে পারবে। পর্যটকদের জন্যও বিমানের এই রুটটি হতে পারে খুবই সম্ভাবনাময়।

কারণ এই রুট ব্যবহার করলে কম খরচেই পর্যটকরা বাংলাদেশে আসতে পারবেন। চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকরাও সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে নেপাল, ভুটান ও ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

এর বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বিমানবন্দরটি চালু হলে লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর, কুড়িগ্রামের সোনাহাট স্থলবন্দরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভারত, ভুটান ও নেপালের ব্যবসায়ীদেরও বাংলাদেশে যাতায়াত সহজ হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বাংলাদেশের উত্তরের জনপদ।

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ‘লালমনিরহাট বিমানবন্দর’টি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজ সরকারকে তথা তৎকালীন ভারতবর্ষকে রক্ষার একটি প্রধান বিমান ঘাঁটি। এই বিমানবন্দরের কারণেই ব্রিটিশরা ওই সময় ঠেকিয়ে দিয়েছিল নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের অগ্রযাত্রাকে।

লালমনিরহাটকে তখন বলা হতো ‘গেটওয়ে টু নর্থ-ইস্ট’ এবং ‘মাউথ অব আসাম’; ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তখনকার বিশাল প্রদেশ বৃহত্তম আসামে প্রবেশের একমাত্র পথ ছিল লালমনিরহাট। রেলপথের ‘লালমনিরহাট জংশন’ এবং বিমান পথে ‘লালমনিরহাট জাহাজ ঘাঁটি’।

ভারত ভাগ না হলে লালমনিরহাট তার এই যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বের জন্য আপন মহিমায় হয়ে উঠত আরেক ‘দ্বিতীয় কলকাতা’। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এক হাজার ১৬৬ একরের বিশাল আয়তনের লালমনিরহাট বিমানবন্দর।

প্রায় চার মাইল লম্বা রানওয়ে, বিশাল টারমার্ক, হ্যাঙ্গার এবং ট্যাক্সিওয়ে থাকলেও ঐতিহাসিক এই বিমানবন্দরটি আজ একেবারেই অবহেলিত, জৌলুশহীন ও বিবর্ণ। লালমনিরহাট বিমানবন্দরের গৌরবময় অতীত এখন শুধুই ইতিহাস। ‘মঙ্গা’র দুর্নাম ঘুচিয়ে অবহেলিত উত্তরাঞ্চলে এখন লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া।

উন্নয়নের ফলে দেশের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় লালমনিরহাটের জনগণেরও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। এ অবস্থায় লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি যাত্রী পরিবহনের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেত, তেমনি এলাকারও উন্নয়ন হতো, জনগণও লাভবান হতো।

দ্রুত সময়ে রাজধানী ঢাকায় যাতায়াতের সুবিধা পেতেন উত্তর জনপদের মানুষ। মানুষের কর্মঘণ্টাও বেঁচে যেত। বিমানবন্দরটিও ফিরে পেত তার অতীত গৌরব। বিমানবন্দরটি চালু হলে ভবিষ্যতে উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ গড়ে উঠবে। নেপাল, ভুটান, শিলিগুড়ি রুটে যাত্রী পরিবহন করার সুযোগ ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদাও পেত এটি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য