আইএনএফ চুক্তি নিয়ে জাতিসংঘে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়াস্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তিতে ভূমিকা রাখা অন্যতম একটি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি নিয়ে জাতিসংঘে একে অপরের মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া।

তিন দশক আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে উভয়পক্ষের ওপর ইউরোপে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রাখায় নিষেধাজ্ঞা আছে।

ট্রাম্প সম্প্রতি ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্স (আইএনএফ) চুক্তিটি থেকে ওয়াশিংটনকে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। মস্কো বলেছে, চুক্তিটি বাতিল হলে বিশ্ব অস্ত্র দৌড়ের ঝুঁকিতে পড়বে।

আইএনফ চুক্তি বহাল রাখতে জাতিসংঘকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নামাতে চেষ্টা করেও রাশিয়া ব্যর্থ হয়েছে, জানিয়েছে রয়টার্স।

জাতিসংঘের অস্ত্রনিরোধ কমিটি যেন ওয়াশিংটন ও মস্কোকে চুক্তি বহাল রাখার আহ্বান জানায়, সেজন্য একটি খসড়া প্রস্তাব বিবেচনার জন্য সাধারণ পরিষদে তুলেছিল রাশিয়া।

অস্ত্রনিরোধ কমিটিতে প্রস্তাব পাঠানোর শেষ সময় ছিল ১৮ অক্টোবর। তারও দুইদিন পর ট্রাম্প আইএনএফ থেকে তার দেশ সরে আসবে বলে জানায়।

যে কারণে, দেরিতে হলেও কমিটি যেন রাশিয়ার প্রস্তাব বিবেচনা করে, তার অনুমোদন চাইতে সাধারণ পরিষদে গিয়েছিল মস্কো।

তাদের অনুরোধ ৫৫-৩১ ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। ৫৪টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল বলেও জানিয়েছে রয়টার্স।

১৯৮৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা মিখাইল গর্বাচেভ ও যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের মধ্যে ওই আইএনএফ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

চুক্তিতে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ৫০০ থেকে সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে সমুদ্রে একই মাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র রাখার ব্যাপারে আপত্তি ছিল না।

রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই চুক্তিটি ‘লংঘন’ করে আসছে বলে দাবি ওয়াশিংটনের। মস্কো এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, যুক্তরাষ্ট্রই চুক্তিটিকে অকার্যকর দেখতে চায়।

“এক বছরের মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি চুক্তি থেকে সরে যায় এবং সব ধরনের অস্ত্র ও পারমাণবিক শক্তিধর অস্ত্রের বিকাশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, আমরা তখন পুরোপুরি একটি ভিন্ন বাস্তবতার সম্মুখীন হবো,” জাতিসংঘের অস্ত্রনিরোধ কমিটিকে বলেন রাশিয়ার বিস্তাররোধ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিভাগের উপপরিচালক আন্দ্রেই বেলুসভ।

ওয়াশিংটন কি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

“তাহলে কেন, কেন তারা চুক্তিটি থেকে বেরিয়ে যেতে চাচ্ছে? কেন তারা তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াতে চাচ্ছে?,” চুক্তিটি থেকে ওয়াশিংটনের বেরিয়ে আসার হুমকির প্রসঙ্গটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তোলারও হুমকি দেন বেলুসভ।

রাশিয়া বললেও নিরাপত্তা পরিষদে দুই দেশেরই ভিটো ক্ষমতা থাকায় এ ধরনের পদক্ষেপ আদতে কোনোই ফল বয়ে আনবে না বলে মন্তব্য করেছে রয়টার্স।

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রনিরোধ বিষয়ক দূত রবার্ট উড জানান, পাঁচ বছর ধরে ওয়াশিংটন মস্কোকে এ বিষয়ে সমঝোতায় আসতে অনুরোধ জানিয়ে গেলেও রাশিয়ার সাড়া মেলেনি।

চুক্তিটি বহাল থাকলেও মস্কো দীর্ঘদিন ধরেই ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের নির্মাণ ও পরীক্ষা চালিয়ে গেছে বলেও অভিযোগ তার।

“সম্প্রতি তারা ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর কথা স্বীকার করলেও সেগুলো চুক্তি নির্ধারিত সীমা লংঘন করে না বলে দাবি অব্যাহত রেখেছে,” বলেন উড।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে ‘ধৈর্য ধরেছে’ বলেও মন্তব্য এ মার্কিন দূতের।

“আমাদের আশা, রাশিয়া সঠিক কাজটিই করবে, এবং এসব ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করবে,” বলেন উড।

আইএনএফ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার ঘটনা নেটো সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও অসন্তোষ বাড়াবে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।

ওয়াশিংটনের এ সিদ্ধান্ত ইউরোপের অনেক দেশকেই চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। এটি এমনকী নেটোকেও বিভক্ত করে ফেলতে পারে, মস্কো যাকে কাজে লাগাবে বলেও মত পর্যবেক্ষকদের।

বৃহস্পতিবার নেটোর ইউরোপীয় সদস্য রাষ্ট্রগুলো এক বিবৃতিতে আইএনএফ চুক্তি বহাল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য