সৌদি আরব সাংবাদিক জামাল খাশুগজির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ‘সবচেয়ে বাজেভাবে ধামাচাপা’ দিতে চেয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নিজের বিয়ের কাগজপত্র আনতে চলতি মাসের প্রথম দিকে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনসুলেটে গিয়েছিলেন ওয়াশিংটন পোস্টের কলামনিস্ট খাশুগজি। সৌদি গুপ্তচররা তাকে ওই কনসুলেটের ভেতরেই হত্যা করে বলে তুরস্কের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

এ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী সৌদি নাগরিকদের ভিসা সুবিধা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাহার করছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে ট্রাম্প কনসুলেটের ভেতর সাংবাদিককে মেরে ফেলায় মিত্র দেশ সৌদি আরবের কড়া সমালোচনা করেন। এ ধরনের ঘটনা ‘কখনোই ঘটা উচিত ছিল না’ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

“এ ধরনের মৃত্যুদণ্ড কিংবা ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনা কখনোই ঘটা উচিত ছিল না। এমনটা ঘটাই উচিত হয়নি,” বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

কনসুলেটে খুনের বিষয়ে কিছুই জানতেন না দাবি করা সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সোমবার এ নিয়ে কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সৌদি রাজপরিবারের সাম্প্রতিক বেশকিছু নীতির সমালোচক খাশুগজিকে হত্যার পেছনে নিজেকে ‘সংস্কারবাদী’ হিসেবে চিত্রায়িত করতে চাওয়া মোহাম্মদের হাত আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পশ্চিমা মহলে। এ ঘটনায় ক্রাউন প্রিন্সের দায় নিশ্চিত হওয়া গেলে তা রিয়াদের সঙ্গে ইউরোপ-আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা পর্যবেক্ষকদের।

খাশুগজির বিষয়টি সৌদি কর্মকর্তারা বাজেভাবে পরিচালনা করেছেন বলেও মত ট্রাম্পের।

“বাজে ব্যাপার, এ ধরনের কিছু কখনোই ভাবিনি। কেউ কেউ একেবারেই জট পাকিয়ে ফেলেছে। তারা সবচেয়ে বাজেভাবে এটি ধামাচাপা দিতে চেয়েছে,” হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

খাশুগজি হত্যাকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করবেন বলেও জানান ট্রাম্প।

নিজেদের কনসুলেটের ভেতর হত্যাকাণ্ডের শিকার খাশুগজিকে নিয়ে গত তিন সপ্তাহে সৌদি আরবের ভাষ্য কয়েকবারই বদলেছে।

শুরুর দিকে খাশুগজি ‘কনসুলেটে প্রবেশের অল্প সময়ের মধ্যে বেরিয়ে গেছেন’ এবং তার ‘নিখোঁজকাণ্ডে’ রিয়াদের সংশ্লিষ্টতা নেই দাবি করলেও দুই সপ্তাহ পর তুরস্কের তদন্তের মধ্যেই রাজপরিবারের সমালোচক সাংবাদিককে হত্যার কথা স্বীকার করে সৌদি আরব।

দুর্বৃত্ত কর্মকর্তাদের হাতেই খাশুগজি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, রিয়াদের এমন ভাষ্য মঙ্গলবারও প্রত্যাখ্যান করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিজেপ তায়িপ এরদোয়ান।

তিনি তার বক্তব্যে ইস্তাম্বুলের কনসুলেটে খাশুগজিকে হত্যার পেছনে কারা আছে, তা বের করতে ‘শীর্ষ থেকে তলানি পর্যন্ত’ অনুসন্ধান চালাতে রিয়াদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

বছরখানেক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা সাংবাদিক খাশুগজিকে হত্যায় মূল দায়ী কে, ট্রাম্প তার বক্তব্যে তা স্পষ্ট করেননি। তবে এ ঘটনায় সৌদি আরবের সরকারি ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কয়েকজনকে যুক্তরাষ্ট্র চিহ্নিত করেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও।

পরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সন্দেহভাজন ২১ সৌদি নাগরিকের ভিসা বাতিল অথবা তাদের মার্কিন ভিসার জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে। সন্দেহভাজনদের বেশিরভাগেরই মার্কিন ভিসা আছে বলে জানিয়েছেন অন্য এক কর্মকর্তা।

যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কেবল তাদেরই নয়, যারা এ ঘটনার সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত তাদেরও চিহ্নিত করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায় মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাও খতিয়ে দেখছে বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

“এ শাস্তিই এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ কথা হবে না। না প্রেসিডেন্ট, না আমি কেউই এ ঘটনায় খুশি নই,” বলেন তিনি।

রয়টার্স এ প্রসঙ্গে ওয়াশিংটনের সৌদি দূতাবাসের মন্তব্য জানতে চাইলেও তাতে সাড়া মেলেনি।

খাশুগজির মৃত্যু নিয়ে সৌদি আরবের করা তদন্তের অংশ হিসেবে এর মধ্যেই ১৮ জনকে গ্রেপ্তার ও পাঁচ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সৌদি গণমাধ্যম।

বরখাস্তদের মধ্যে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সৌদ আল-কাহতানিও রয়েছেন। মোহাম্মদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো এ কাহতানিই পরিচালনা করতেন। তিনি স্কাইপের মাধ্যমে খাশুগজি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার দুটি সূত্র জানিয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশ মোহাম্মদের কাছ থেকে এসেছে বলে মার্কিন অনেক আইনপ্রণেতা সন্দেহ করলেও মঙ্গলবার তুরস্কের পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে এরদোয়ান সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের নাম উল্লেখ করেননি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য