৮ বছরেও চালু হয়নি ‘তিন বিঘা করিডোর এক্সপ্রেস’আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ বুড়িমারী স্থলবন্দর-ঢাকা রুটে চলাচলের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘তিন বিঘা করিডোর’ নামের একটি নতুন আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন চালুর কথা ছিল। কিন্তু গত ৮ বছরেও ট্রেনটি চালু করতে পারেনি রেলপথ মন্ত্রণালয় ও পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে বিভাগ। আর এ সরকারের মেয়াদে তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও নেই। সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন, রেল মন্ত্রণালয় থেকে কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসাতেই ট্রেনটি চালু করা যাচ্ছে না।

২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর পাটগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই ট্রেনটি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় দফায় লালমনিরহাট সফরে যান। স্থানীয় জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত লালমনিরহাট কালেক্টরেট মাঠের জনসভায় ট্রেনটি চালুর বিষয়ে তিনি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। কিন্তু তিন বিঘা করিডোর এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনটি সেই সরকারের মেয়াদে চালু করা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এই মেয়াদেও ট্রেনটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ট্রেন চালু না হওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বিচ্ছিন্ন এলাকা ‘দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতা।’ ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল মৌজা দুইটি। ৬৪ বছর ‘নিজ ভূমে পরবাসী’ জীবন যাপন করে ২০১১ সালে মুক্তি পায় দহগ্রাম আঙ্গোরপোতাবাসী। ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহলবাসীদের অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটে।

পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতাবাসীর চলাচলের জন্য ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে তিন বিঘা করিডোর গেট দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার জন্য খুলে দেন। বিকালে পাটগ্রাম সরকারি জসমুদ্দিন কাজী আব্দুল গণি ডিগ্রি কলেজ মাঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। পাটগ্রামের সেই জনসভায় তিনি বুড়িমারী স্থলবন্দর-ঢাকা রুটে সরাসরি আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচলের জন্য তিন বিঘা করিডোর এক্সপ্রেস ট্রেন চালুসহ ১০টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নবম সংসদের মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনার দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি গুলোর মধ্যে প্রায় সবগুলোর বাস্তবায়নই বর্তমানে শেষের পথে রয়েছে। অথচ দশম সংসদের মেয়াদ শেষ হতে চললেও এখন পর্যন্ত আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রতিশ্রুতিটি বাস্তবায়িত হয়নি।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতির ‘তিন বিঘা করিডোর’ এক্সপ্রেস ট্রেনটি চালু করা হচ্ছে না। নতুন কোচ ও লোকোমোটিভ ক্রয়ের পর তা দেশে আনা হলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি চিন্তা-ভাবনা করে দেখা যেতে পারে।

দশম জাতীয় সংসদের রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লালমনিরহাট সফর আয়োজন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত ‘তিন বিঘা করিডোর’ এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনটি চালুর অনুরোধ করেন লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগ ও স্থানীয় চার সংসদ সদস্য।

রেলমন্ত্রী সেসময় বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা আমার জন্য ফরজ।’ ঢাকায় ফিরে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করার ঘোষণা করেন তিনি। দশম সংসদের মেয়াদ ফুরিয়ে যাচ্ছে, অথচ এখন পর্যন্ত তিনি কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় সদর দপ্তরের সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা সাজ্জাত হোসেন বলেছেন, ‘শুনেছি নতুন কোচ ও লেকোমোটিভ কেনা হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত তিন বিঘা করিডোর এক্সপ্রেস ট্রেনটি চালু করা হবে। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে তা সম্ভব নয়।’

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার কথা উল্লেখ করে পাটগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম নাজু বলেছেন, ‘তিন বিঘা করিডোর এক্সপ্রেস ট্রেনটি এখন পর্যন্ত চালু করা যায়নি। এটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল হোসেন ও লালমনিরহাট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি শেখ আব্দুল হামিদ বাবুর ভাষ্য, ‘একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর সবার আগে সেই কাজটি বাস্তবায়ন হওয়া জরুরি। অথচ আমরা জাতি হিসেবে সেই সংস্কৃতি চালু করতে পারিনি। গত ৮ বছরে হয়নি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর নিকট আবেদন করি তিনি খুব শীঘ্রই ট্রেনটি চালুর ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবেন।’

লালমনিরহাট বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজার রহমানের ভাষ্য, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত তিন বিঘা করিডোর আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি বুড়িমারী স্থলবন্দর-ঢাকা রুটে চালানোর জন্য অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। আমরাও ট্রেনটি পরিচালনা করতে প্রস্তুত। সেটি পুরাতন রেক ও লোকোমোটিভ দিয়ে পরিচালনা করা হবে কি না, সে ব্যাপারেও রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে কোন নির্দেশনা পাইনি। নতুন কোচ ও লেকোমোটিভ কেনার প্রক্রিয়া চলছে। যদি এই নতুন ট্রেনটি পরিচালনার জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে নতুন কোচ ও লোকোমোটিভ সরবরাহ করা হয় তাহলে তো কোন সমস্যাই থাকবে না। কিন্তু যেভাবে নতুন ট্রেনটি চালানো হোক না কেন তার বিষয়ে অবশ্যই রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে কার্যকর সিদ্ধান্ত আসতে হবে। তাছাড়া মাঠ পর্যায়ে আমার পক্ষে কোন কিছু করা সম্ভব নয়।’

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বলেন, ‘চলতি বছর ১১ জানুয়ারি মাননীয় রেলপথমন্ত্রী লালমনিরহাট সফর করেন। উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতির তিন বিঘা করিডোর এক্সপ্রেস ট্রেনটি চালুর ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এরপর আমরা কোনও কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েছে বলে আমার জানা নেই। অবশ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অন্য সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে। ফোর লেন কাজও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিন বিঘা করিডোর নামের আন্তঃনগর ট্রেনটি চালু করার কোন সম্ভবনা নেই। লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনে অনেক কোচ পড়ে আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাইলে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে বিভাগ থেকে দুইটি লেকোমোটিভ এনে আপাতত পুরাতন কোচ দিয়েই ট্রেনটি চালু করা সম্ভব। পরবর্তীতে নতুন কোচ ও লেকোমোটিভ সংযোজন করা যেতে পারে।’

লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবেক প্রতিমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট (অবঃ) মোতাহার হোসেন এমপি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে রেলপথ মন্ত্রণালয় কালক্ষেপণ করছে। এই বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রীকেসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লালমনিরহাট নিয়ে আসা হয়েছিল। একটি নির্দেশনা দিলেই পুরাতন রেক দিয়ে হলেও তিন বিঘা করিডোর এক্সপ্রেস ট্রেনটির পরিচালনা শুরু করা যেত। কিন্তু তিনি কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।’

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য