মসজিদ-মন্দিরে সম্প্রীতির বন্ধন লালমনিরহাটে আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যা ৬টা ছুঁই ছুঁই। মসজিদে চলছিল মুয়াজ্জিনের আজানের প্রস্তুতি। ঠিক একই সময় এর লাগোয়া মন্দিরের পুরোহিতও ব্যস্ত ছিলেন পূজার প্রস্তুতি নিয়ে।

মুয়াজ্জিন-পুরোহিত একই জায়গায় একই সময় ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের আরাধনার প্রস্তুতি নিলেও কেউ কারও প্রার্থনার ব্যাঘাত ঘটান না কখনো। দুই তরফ থেকেই সচেতন দৃষ্টি রাখা হয়— যেন অন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রার্থনায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।

এ কারণে লালমনিরহাট জেলা শহরের কালীবাড়ী এলাকার ‘পুরান বাজার জামে মসজিদ’ ও ‘কালীবাড়ী কেন্দ্রীয় মন্দির’ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যা যুগ যুগ ধরে দেখে আসছেন স্থানীয় লোকজন।

এছাড়া লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার দলগ্রাম বাজার জামে মসজিদ ও দলগ্রাম কেন্দ্রীয় দুর্গা মন্দির একই স্থানে পাশাপাশি অবস্থিত।

এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি মসজিদ মন্দির থাকলেও উভয় ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে থেকে স্ব-স্ব ধর্ম পালন করে আসছেন। ধর্ম পালন নিয়ে কখনও কোনো বাকবিতণ্ডা হয়নি বলে স্থানীয়দের জানান।

উভয় ধর্মের পবিত্রতা বজায় রেখেই পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছেন দুই ধর্মের মানুষ। শুধু নামাজ বা পূজা-অর্চনাই নয়, সব ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শান্তিপূর্ণ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালন করা হয়।

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। যার অনেক নিদর্শন আছে দেশের নানা প্রান্তে। ভোরে ফজরের নামাজের সময় মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে সুমধুর আজান শেষে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করে চলে যাওয়ার পরে ঠিক পাশেই মন্দিরে শোনা যায় উলুধ্বনি। এমনই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন লালমনিরহাট শহরের শতবর্ষী মসজিদ ও মন্দির দুটি।

লালমনিরহাট কালীবাড়ী এলাকার কাশেম আলী জানান, এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো হানাহানি ও মতবিরোধ নেই। এসব ছাড়াই এখানে শত বছর ধরে এভাবেই পারস্পারিক সহযোগিতায় ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষ। ফলে সম্প্রীতির এ স্থানটি দেখতে বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন এখানে।

লালমনিরহাট পুরানবাজার কালীবাড়ী মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষ সনদ চন্দ্র সাহা জানান, ১৮৩৬ সালে দুর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠার আগে এখানে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পুরান বাজার এলাকা অনেকের কাছে কালিবাড়ি নামে পরিচিত হয়ে উঠে। এর পর মন্দির প্রাঙ্গণে ১৯০০ সালে একটি নামাজ ঘর নির্মিত হয়। এ নামাজ ঘরটিই পরবর্তীতে পুরান বাজার জামে মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে। এর পর থেকে কোনো বিবাদ ছাড়াই সম্প্রীতির সঙ্গে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি করে আসছে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।

পুরান বাজার জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফজল মিয়া জানান, ধর্মীয় সম্প্রীতির এটি একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। যুগ যুগ ধরে একই উঠানে চলছে নামাজ ও পূজা-অর্চনা। নামাজের সময় মন্দিরের ঢাক-ঢোল বন্ধ রাখা হয়। আযান ও নামাজে তো খুব বেশি সময় লাগে না। এ সময় টুকু পূজারিরা ঢাক-ঢোলসহ অন্যান্য শব্দযন্ত্র বন্ধ রাখেন। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে এ সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ধর্মীয় উৎসব পালন করছেন তারা।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বলেন, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার- এটিই এখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন। যার প্রমাণ এক উঠানে কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী মন্দির ও পুরান বাজার জামে মসজিদ।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য