তারাগঞ্জে দুই ঘাটে নড়বড়ে সাঁকোই একমাত্র ভরসাসিরাজুল ইসলাম বিজয়, তারাগঞ্জ (রংপুর) থেকেঃ রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার যমুনেশ্বরী নদীর জয়বাংলা ও রহিমাপুর ঘাটে সেতু না থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে ২২ গ্রামের প্রায় ২৪ হাজার মানুষ। তাঁরা নড়বড়ে সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।

জয়বাংলার ঘাট পাশেই নারায়ণজন গ্রামের দিনমজুর নিজাম আলী (৪০) বলেন, ‘পুলের জন্যে চাইরটা এমপি ভোটোত হামরা গ্রামের মানুষ অনেক আশা করি একবার নৌকাত, একবার ধানের শীষোত, দুইবার লাঙ্গল মার্কায় ভোট দিছিনো। কিন্তু কায়ও হামাক পুল বানে দেয় নাই।’

উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের জয়বাংলা খেয়াঘাট। এ ঘাটের দুইপাড়ে জয়বাংলা, বুড়িরহাট, পঞ্চায়েতপাড়া, নারায়ণজন, তেলিপাড়া, পালপাড়া, মাছুয়াপাড়াসহ ১০টি গ্রাম আছে। এলাকাবাসী চাঁদা তুলে ওই ঘাটে সাঁকো বানালেও বর্ষাকালে যমুনেশ্বরী নদীর পানি বেড়ে সেটি ডুবে যায়। তখন নৌকা বা কলার ভেলাই একমাত্র ভরসা।

রবিবার সকাল ৯টায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই খেয়াঘাটে গ্রামের লোকজন নিজ উদ্যোগে একটি সাঁকো তৈরি করলেও তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সাঁকোর খুঁটি নড়বড়া হয়ে গেছে। নড়বড়ে সাঁকোর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থী ও পথচারীরা চলাচল করছে।

জয়বাংলা গ্রামের বৃদ্ধ হাফিজুল ইসলাম (৬২) বলেন, ‘বাহে হামার বাপ-দাদারাও এই নদীর জন্যে কষ্ট প্যায়া মরি গেইছে। হামরাও যাবার পথে, তবু এটেকোনা পুল হয়ছে না।’

পালপাড়া গ্রামের কৃষক যতীন চন্দ্র (৬৫)বলেন, ‘ভোট আসলে নেতারা দিনে রাইতে বাড়ি ঘরোত পাক পারি কয়, তোমার নদীটাতো বড় সমস্যা। ভোট দেও এবার ব্রীজ হয়্যা যাইবে। হামরা তাতে মাতি ভোট দেই। কিন্তু ব্রীজ আর পাই না।’

হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হারুন-অর-রশিদ বলেন, এখানে সেতু নির্মাণ হলে অবহেলিত এ অঞ্চলে বিপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

এদিকে তারাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে কুর্শা ইউনিয়নের রহিমাপুরঘাট। এ খেয়াঘাটের দুই পারে আছে ১২টি গ্রাম। এর মধ্যে কবিরাজপাড়া, খিয়ারপাড়া, হাজিপাড়া, কুঠিপাড়া, জুম্মাপাড়া, সরকারপাড়া, চাকলা, জলুবার, নদীরপার, পাচানীসহ ১২টি গ্রামের প্রায় ১৩হাজার মানুষকে সাঁকো দিয়ে পারপার হয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়।

সকাল ১০টায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই খেয়াঘাটের সাঁকোটি বেশ নড়বড়ে। শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী ওই সাঁকো দিয়ে চলাচল করছে।

খিয়ারপাড়া গ্রামের কৃষক আফছার হোসেন(৪৫) বলেন, ‘সাঁকো পেরিয়ে ৬ কিলোমিটার দূরে তারাগঞ্জ উপজেলা সদর। কিন্তু কৃষিপণ্য নিয়ে সাঁকোর ওপর দিয়ে চলাচল করা যায় না। তাই ৪ কিলোমিটার বেশি পথ ঘুরে ইকরচালী ইউনিয়ন দিয়ে কৃষি পণ্য উপজেলা সদরে নিতে হয়। এতে পণ্য বহনের খরচ বেড়ে যায়।’

কুর্শা ইউনিয়নের ইউপি সদস্য তুহিনুর ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনের আগে ওই স্থানে সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন সব প্রার্থী। নির্বাচন হয়ে গেলে আর কোনো খোঁজ থাকে না। সেতু নির্মাণ না করায় ১২টি গ্রামের কৃষকেরা ধান,পাট,আলু সবজির ভালো দাম পাচ্ছে না।’

জলুবার গ্রামের লোকমান হোসেন (৩৮) বলেন, ‘সরকার কত কিছু করে, খালি হামার গ্রামের কাছত পুল কোনা বানেবার পারে না। এটে একনা পুলের জন্য হামার কষ্ট চিরকাল।’

কুঠিপাড়া গ্রামের জলিল মিয়া (২৮) বলেন, ‘নদীতে সেতু না থাকায় ধান, পাট, শাক-সবজি শহরে নিয়া বিক্রি করা মুশকিল। বাধ্য হয়ে কম দামত জিনিসপত্র বেঁচতে হয়।’
রহিমাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মৃনাল কান্তি জানান, রহিমাপুরঘাটে সেতু না থাকায় বর্ষাকালে নদীর ওপারের পাচানী, জলুবার, নদীপার গ্রামের বেশির ভাগ শিশু ভয়ে স্কুল আসতে চায় না।

কুর্শা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আফজালুল হক বলেন, ওই স্থানে সেতু নির্মাণের জন্য সাবেক সাংসদকে অনুরোধ করা হয়েছিল। বর্তমান সাংসদকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। সেতুর অভাবে এখন ১২টি গ্রামের মানুষ কষ্টে চলাচল করছেন।

উপজেলা প্রকৌশলী আহাম্মেদ হায়দার জানান, শিগগিরই খোঁজ নিয়ে ওই দুই স্থানে সেত নির্মাণের জন্য বরাদ্দ চেয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঢাকায় পাঠানো হবে।

তারাগঞ্জের যমুনেশ^রী নদীর জয়বাংলা ঘাটে সেতু না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়ে পথচারীদের চলাচল করতে হচ্ছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য