10 23 18

মঙ্গলবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং | ৮ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৩ই সফর, ১৪৪০ হিজরী

Home - দিনাজপুর - মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষায় ৩য় স্থান অর্জনকারী বীরগঞ্জের সজিব, দারিদ্রতা নিয়ে আশংকা

মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষায় ৩য় স্থান অর্জনকারী বীরগঞ্জের সজিব, দারিদ্রতা নিয়ে আশংকা

মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষায় ৩য় স্থান অর্জনকারী বীরগঞ্জের সজিব, দারিদ্রতায় আশংকাদিনাজপুর সংবাদাতাঃ ২০১০ সালে কাটগড় আদিবাসী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে পঞ্চম শ্রেনীর সমাপনি পরীক্ষায় বীরগঞ্জ উপজেলার মধ্যে প্রথম হয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দেয় দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের কাটগড় রাজাপুকুর গ্রামের সজিব চন্দ্র রায়। চরম দারিদ্রতার সাথে বসবাস তার। বাবা মনোধর চন্দ্র রায় সংসারের ভরণ-পোষন নির্বাহের জন্য রিক্সাভ্যান চালাতেন। মা চারুবালা রায় দিনমজুরের কাজ করেন।

App DinajpurNews Gif

মনোধর চন্দ্র রায় সংসারের ভরণ-পোষন নির্বাহের জন্য একমাত্র ভরসা ছিল একটি রিক্সাভ্যান। এক সময় এক ছেলে এবং এক মেয়ের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে সেই রিক্সাভ্যান বিক্রি করতে হয় তাকে। এরপর সংসার নেমে আসে চরম অভাব। অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে তিনি কাজ নেন গাছ কাটার শ্রমিক হিসেবে।

এই চরম দারিদ্রতা কোনভাবেই থামাতে পারেনি সজিব চন্দ্র রায়ের অদম্য ইচ্ছা ও তার মেধাশক্তিকে। তাইতো দরিদ্র বাবা এবং মায়ের সন্তান হয়েও এবারের মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে জাতীয় মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে দারিদ্র-পীড়িত এই মেধাবী শিক্ষার্থীটি।

২০১০ সালে বাড়ীর পাশ্ববর্তী কাটগড় আদিবাসী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে পঞ্চম শ্রেনীর পাবলিক পরীক্ষায় গোটা বীরগঞ্জ উপজেলার মধ্যে প্রথম হয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়। পরবর্তীতে স্থানীয় গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে জেএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ সহ ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি এবং একই বিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্ব অর্জন করে। এরপর ২০১৮ সালে সৈয়দপুর সরকারী টেকনিক্যাল কলেজ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাশ করে সে। সবশেষ এবারের মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় এমসিকিউকে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৮৫.৭৫ এবং সার্টিফিকেটে ২০০ নম্বরের মধ্যে ২০০ নম্বর পেয়ে সারাদেশের মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করে আলোড়ন সৃষ্টি করে সজিব চন্দ্র রায়।

তার এই অর্জনে পাড়া জুড়ে উৎসব চলছে। আনন্দে মেতেছে প্রতিবেশিরা। প্রতিবেশিদের উদ্যোগে চলছে মিষ্টি বিতরণ।

তবে মেডিকেলে কৃতিত্বের সাথে ভর্তির সুযোগ পেয়েও এখন তার স্বপ্ন দরিদ্রতার অভিশাপে দুঃস্বপ্ন হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ১১ নং মরিচা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম কাটগড় রাজাপুকুর। এই গ্রামেই একেবারে চরম দরিদ্র পরিবারে ২০০০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী জন্ম সজিব চন্দ্র রায়ের। দারিদ্রতায় জর্জরিত সজিব চন্দ্র রায় স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে চিকিৎসক হবে। শত প্রতিকুলতার মধ্যেও অদম্য ইচ্ছা ও মেধাশক্তির ফলে এবারের মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে সারাদেশের মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পায় সে। ভর্তি পরীক্ষায় তার রোল নং-১৯০৯৩১।

নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া তার একমাত্র বোন শিল্পি রায় প্রচন্ড মেধাবী বলে জানিয়েছে প্রতিবেশিরা। সে সমাপনি এবং জুনিয়র স্কুল পরীক্ষায় মেধার সাথে পাশ করে বৃত্তি পেয়েছে।

কৃতি শিক্ষার্থী সজিব চন্দ্র রায় জানায়, চতুর্থ শ্রেনীতে অধ্যয়নকালে একবার সে চরম অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। তখন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে তারা বাবা-মা। অর্থাভাবে ঠিকমত চিকিৎসা করাতে হিসসিম খেতে হয় তার মা-বাবা কে। তখন থেকে তার ইচ্ছা- বড় হয়ে সে চিকিৎসক হবে এবং দেশের মানুষের সেবার পাশাপাশি পরিবারকে দারিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করবে। সুস্থ্য হয়ে বাড়ী ফিরে চিকিৎসক হওয়ার অদম্য ইচ্ছা শক্তি নিয়েই লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করে সে। চরম দারিদ্রতার মধ্যেও তার অদম্য ইচ্ছা আর প্রবল মেধাশক্তির ফলে এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

সজিবের বাবা মনোধর চন্দ্র রায় জানান, জমি বলতে বাড়ীর ভিটাটুকু আর কিছুই নাই তার। আগে রিক্সাভ্যান চালাতেন। পরবর্তীতে ছেলের লেখাপড়ার জন্য সংসারের একমাত্র সম্বল রিক্সাভ্যানটি বিক্রি করে দেন। এখন গাছ কাটা কাজ করে সংসার চালান তিনি। এরই মধ্যে ছোট থেকেই ছেলে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখলে অভাবের এই সংসারে চোখে মুখে অন্ধকার দেখে সে। ছোটবেলা থেকেই ছেলের কোন আবদার না থাকলেও তার একটিই আবদার বড় হয়ে সে ডাক্তার হবে। ছেলের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ও ইচ্ছা মাঝে মাঝে তাকে বিমর্ষ করে। দারিদ্র-পীড়িত এই সংসারে কি-করে এটা সম্ভব? এরপর ছেলের অদম্য ইচ্ছায় আর লেখাপড়ায় কঠোর মনোনিবেশ করায় প্রাণশক্তি জোগায় সে। অবশেষে মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষায় সারাদেশের মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করায় বাবা মনোধর হাসোজ্জল থাকলেও মাঝে মাঝে চোখে-মুখে হতাশার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। ডাক্তারী পড়ার টাকা কি-করে যোগাড় করবে?-এখন এই চিন্তাই তার। দারিদ্রতার অভিশাপ,তাদের এই স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নে পরিনত হবে না-তো? এমন আশংকা তার। এজন্য ছেলে ও পরিবারের এই স্বপ্ন বাস্তরে রূপ দিতে দেশবাসী ও বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

সজিবের মা চারু বালা রায় জানান, দারিদ্র-পীড়িত এই সংসারে স্বামীর রোজগার দিয়ে নিয়মিত উনুন (চুলা) জ্বালাতে গিয়েও মাঝে মাঝে হোচট খেতে হয়। কিন্তু এরপরও তিনি স্বপ্ন দেখেন, তারা যে কষ্ট করছে-তাদের সন্তানদের যাতে এরকম কষ্ট না করতে হয়। এজন্য এক ছেলে ও এক মেয়ের লেখাপড়া আর সংসারের বাড়তি খরচ মেটাতে তিনিও বসে না থেকে বের হন দিনমজুরের কাজ করতে। কৃষি শ্রমিক হিসেবে দিন-রাত মাঠে পরিশ্রম করে সংসারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করে সে। অবশেষে ছেলে মেডিক্যাল কলেজে কৃতিত্বের সাথে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর তিনি তার ভাষায় বলেন, ভগবান যাতে হামার শেষ ইচ্ছা পুরন করে”।

সজিবের ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার যে অদম্য ইচ্ছা-সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য উৎসাহ ও সহযোগিতা করেন তার শিক্ষক জহুরুল ইসলাম মানিক ও মোঃ হেলাল উদ্দীন। মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার খবর পেয়ে গত সোমবার সজিবের বাড়ীতে আসেন এই দুজন শিক্ষক।

তারা জানান, এরকম মেধাবী শিক্ষার্থী সমাজে খুবই বিরল। তবে ছোটবেলা থেকেই তার যে প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও মেধা, তাতে তারা মনে করেছিলেন, বাবা-মায়ের দারিদ্রতা তার এই ইচ্ছা শক্তিকে কখনই থামাতে পারবে না। আজ তা সত্যিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সজিব একজন ভালো চিকিৎসক হয়ে উচ্চ শিখরে আরোহন করবে বলে এই দুজন শিক্ষকের বিশ্বাস। এ জন্য তাকে উৎসাহ যোগানো এই দুজন শিক্ষকও দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন।

এদিকে প্রতন্ত অঞ্চরের দরিদ্র পরিবারের হয়েও সজিব চন্দ্র রায় মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় সারাদেশের মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করার আলোচনায় গোটা বীরগঞ্জ ও দিনাজপুর জেলা। আর এ জন্য প্রতিদিন মানুষ ভীড় করে সজিবের গ্রামের বাড়ী বীরগঞ্জ উপজেলার কাঠগড় রাজাপুকুরে। এসময় প্রতিবেশীরা আনন্দের মিষ্টিও বিতরণ করে। বেড়া ও খড়ের চালে নির্মিত জরাজীর্ণ বাড়ীতে গত দুদিন ধরে ভীড় করে হাজারো মানুষ।

প্রতিবেশীসহ সকলেই এসময় প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, গ্রামের গরীব পরিবারের সন্তান হলেও সজিব একদিন বড় চিকিৎসক হয়ে অবহেলিত এই এলাকার মানুষের চিকিৎসা সেবায় অনন্য ভুমিকা পালন করবে। এ জন্য সজিবের জন্য শুভকামনা করেন তারা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য