ট্রাম্পের আমেরিকার ভাবমূর্তিতে ধস জরিপডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে যুক্তরোষ্ট্রের ভাবমূর্তির বড় ধরনের অবনতি হয়েছে বলে উঠে এসেছে এক আন্তর্জাতিক জরিপের ফলাফলে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ২৫টি দেশের নাগরিকদের ওপর ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের চালানো ওই জরিপের ফলাফল গত সোমবার প্রকাশ করা হয়।

চলতি বছরের ২০ মে থেকে ১২ অগাস্টের মধ্যে পরিচালিত ওই জরিপে দেখা যাচ্ছে, কেবল রাশিয়া, কেনিয়া ও ইসরায়েলের নাগরিকদের কাছেই যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ২০১৬ সালের তুলনায় উন্নতি হয়েছে।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে তারা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই পোষণ করেন।

কিন্তু মাত্র ২৭ শতাংশ উত্তরদাতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখার কথা বলেছেন। ৭০ শতাংশ বলেছেন, ট্রাম্পের ওপর ভরসা রাখা যায় বলে তারা মনে করেন না।

আস্থার জায়গায় বিশ্বনেতাদের মধ্যে ট্রাম্পের অবস্থান রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন (৩০ শতাংশ), চীনের শি জিনপিংয়ের (৩৪) চেয়ে পেছনে।

অন্যদিকে ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা জার্মানির আঙ্গেলা মের্কেল এবং ৪৬ শতাংশ উত্তরদাতা ফ্রান্সের ইমানুয়েল মাক্রোঁর ওপর আস্থা রাখার কথা বলেছেন।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭০ শতাংশ মনে করেন, অন্য দেশের স্বার্থকে ‍যুক্তরাষ্ট্র পাত্তা দেয় না। আর বিশ্বের বড় সঙ্কটগুলো মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন মাত্র ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা।

দশ বছর আগের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনকেই এগিয়ে রেখেছেন বেশিরভাগ উত্তরদাতা।

৭০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে চীন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ প্রশ্নে ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলেছেন।

বিশ্বের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব কার হাতে- এই প্রশ্নে ৩৯ শতাংশ উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্র এবং ৩৪ শতাংশ চীনের কথা বলেছেন।

চলতি বছর ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বক্তব্যের কারণে কানাডা ও জার্মানির মত মিত্র দেশের মানুষের কাছেও যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি খারাপ হয়েছে বলে জরিপে প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও ইরান পারমাণবিক চুক্তির মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের মতো কর্তৃত্ববাদী নেতাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা দেখিয়েছেন, কিন্তু প্রতিবেশী মিত্র দেশগুলো ও নেটো জোটের মিত্রদের সমালোচনা করেছেন।

চলতি বছরের জুনে কানাডায় শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ এর সম্মেলনের পর যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গে যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ট্রাম্প; আয়োজক দেশ কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে ‘খুবই অসৎ ও দুর্বল’ বলে বিদ্রুপ করেছিলেন।

বাণিজ্য উদ্বৃত্তি, প্রতিরক্ষায় নূন্যতম ব্যয় ও রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে জার্মানির বিরদ্ধেও একের পর এক তোপ দেগে যাচ্ছেন ট্রাম্প।

গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তৃতায় ট্রাম্প দাবি করেন, হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব নেওয়ার পর তার দুই বছরের অর্জন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রায় সব প্রশাসনকে ছাড়িয়ে গেছে। ওই বক্তব্যের জন্য তিনি জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের হাসির পাত্র হয়েছেন।

পিউ রিসার্চের জরিপ বলছে, ট্রাম্পের মেয়াদের প্রথম বছর ২০১৭ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তির বড় ধরনের অবনমন ঘটে এবং ২০১৮ সালেও তা অব্যাহত আছে।

মাত্র ৩০ শতাংশ জার্মান এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রসন্ন, গত বছরের তুলনায়ও যা ৫ শতাংশ পয়েন্ট কম।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করার কথা বলেছেন ৩৮ শতাংশ ফরাসি ও ৩৯ শতাংশ কানাডিয়ান।

কিন্তু মাত্র ৭ শতাংশ স্প্যানিশ, ৯ শতাংশ ফরাসি ও ১০ শতাংশ জার্মান ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখার কথা বলেছেন।

উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে মেক্সিকানদের কাছেই যুক্তরাষ্ট্রের কদর গত বছরের তুলনায় খানিকটা বেড়েছে। তারপরও দেশটির মাত্র ৩২ শতাংশ উত্তরদাতা ওয়াশিংটনকে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা বলেছেন।

জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সবচেয়ে প্রসন্ন ইসরায়েল, ফিলিপিন্স ও দক্ষিণ কোরিয়া। তিনটি দেশেই ৮০ শতাংশ বা তারও বেশি উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সমর্থনের কথা বলেছে।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার এমন হালের পরও জরিপের ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব মোড়লের ভূমিকায় দেখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করার কথা বলেছেন। চীনকে এ ভূমিকায় দেখতে চান মাত্র ১৯ শতাংশ উত্তরদাতা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য