যেকোনও সময় প্রাণঘাতী দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে ইয়েমেনেখাবারের দামের ঊর্ধ্বগতি ও দেশের প্রধান বন্দর এলাকায় যুদ্ধ তীব্র হওয়ায় ইয়েমেনে যেকোনও সময় বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন জাতিসংঘের মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমের প্রধান মার্ক লোকোক। এই দুর্ভিক্ষে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কাও করছেন তিনি।

লোকোক বলেন, এখন একটি অনিবার্য দুর্ভিক্ষের বিষয়টি নিশ্চিত। এটা ঠেকানো অনেক কঠিন হবে। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে ইয়েমেনে খাবারের দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। লাখ লাখ ইয়েমেনির পক্ষে তাদের পরিবারকে খাওয়ানো ইতোমধ্যে কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ায় দেশটির প্রধান বন্দর হোদেইদাহর সক্ষমতা কমে গেছে। শস্য কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া ও রাজধানী সানায় ত্রাণ সরবরাহের প্রধান সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ত্রাণ সংস্থাগুলোও সেখানে খাবার পৌঁছাতে পারছে না। তাই সেখানে বসবাসরত ৮০ লাখ মানুষ এই বছর দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে পারেন।

সোমবার জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ইয়েমেন সংকট নিয়ে আলোচনা করা হবে। তার আগে জাতিসংঘের ত্রাণ বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি লোকোক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘দুর্ভিক্ষের বিষয়ে যা হচ্ছে তার মধ্যে একটা বিষয় হলো হঠাৎ করে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে যার কোনও আভাসই আপনি পাবেন না।’ তিনি বলেন, ‘যখন বিপর্যয় দেখা দেবে, তখন আর কিছু করার থাকবে না। সেখানে খুব দ্রুত অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটবে। তাই আমরা বিষয়টি সবার আমলে আনার চেষ্টা করছি।’

সৌদি বিমান বাহিনীর সহায়তায় আরব আমিরাতের সেনারা হোদেইদাহ বন্দর নগরীতে অভিযান চালাচ্ছে। তারা সেখানে হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াই করছে। বিদ্রোহীরা ২০১৪ সাল থেকে বন্দরটির নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। শান্তি আলোচনার জন্য জুলাই মাসের শুরু থেকে আমিরাত সেখানে হামলা বন্ধ রাখে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও হামলা শুরু করে তারা।

সর্বশেষ হামলার আগে হোদেইদাহ শহরে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ। কিন্তু লোকোক বলেন, ব্যাপক বোমা বর্ষণের পরও সেখানে এখনও কত মানুষ আছে তা পরিষ্কার নয়। তবে জাতিসংঘ সংস্থাগুলো সম্প্রতি ৪২ হাজার পরিবারের মধ্যে খাবার বিতরণ করেছে। সেই হিসেবে সেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ আছে বলে অনুমান করে লোকোক।

অভিজ্ঞ ব্রিটিশ ত্রাণ কর্মকর্তা বলেন, তিনি মনে করেন, শহরটি প্রাণকেন্দ্রে কোনও সরাসরি হামলা না হলেও সেখানকার সরবরাহ রুটে যুদ্ধের একটা নেতিবাচক প্রভাব সেখানে পড়বে। কারণ দেশটি খাদ্য আমদানির ওপর ৯০ শতাংশ নির্ভরশীল।

হোদেইদাহ বন্দরে এখন খুবই কম জাহাজ নোঙর করছে। আর বন্দরটির শস্য কারখানাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাজধানী সানার দক্ষিণাঞ্চলের মহাসড়কে যুদ্ধ চলছে ও মাইন পুতে রাখা হয়েছে। এতে সেখানে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ত্রাণ বহরগুলোকে এখন অনেক ঘোরা পথে বেহাল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। ব্যাপক বোমা বর্ষণের ফলে এসব সড়কের ব্রিজগুলো নষ্ট হয়ে বড় বড় গত তৈরি হয়েছে।

একই সময়ে ইয়েমেনি রিয়ালের দাম কমে যাওয়ায় খাবার সংগ্রহ করা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। লোকোক বলেন, ‘আর যদিও আপনি আপনার খুবই সামান্য আয় দিয়েও খাবার কিনতে চান, তাহলে আপনি ৩০ শতাংশ কম কিনতে পারবেন। আপনারা জানেন, এটা একটা বড় ধরনের আঘাত।’

 

ত্রাণ বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইরিন সম্প্রতি খবর প্রকাশ করে যে, জাতিসংঘ ইয়েমেন থেকে ৫০০০ বেসামরিক লোককে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। লোকেক এই খবর অস্বীকার করে বলেন, ‘হোদেইদাহ শহর খালি করার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চিন্তা এমন ধরনের বিষয় যা আমরা প্রস্তাবও করিনি।’

ইয়েমেনে নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করে বেসামরিক মানুষকে হত্যার ঘটনায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ব্যাপক সমালোচনার মুখে রয়েছে। তবে প্রায় প্রত্যেক ঘটনায়ই তাদের নিজস্ব তদন্তে বাহিনীকে নির্দোষ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তবে লোকেক বলেন, সৌদি আরব স্বীকার করেছে যে, ৯ আগস্ট শিশুদের বাসে বোমা হামলাটি ‘অন্যায্য’ ছিল। তারা এ ধরনের ভুলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জোটটি ত্রাণ কার্যক্রমে ব্যাঘাত না ঘটানোর বিষয়টি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে।

লোকেক বলেন, ‘সেখানে এখন সামরিক কার্যক্রম থেকে ত্রাণ কার্যক্রমকে সুরক্ষিত রাখার জন্য একটি ভাল ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের সব এলাকা, আমাদের বাসস্থান, আমাদের গাড়িবহর, আমাদের টিকাদান কর্মসূচি, আমাদের সব কার্যক্রমকে সুরক্ষিত ও শ্রদ্ধা করা না হলে আমরা আগের মতো ব্যাপক পরিসরে কার্যক্রম চালাতে পারবো না।’

সৌদি আরব ও আরব আমিরাত ইয়েমেনে ত্রাণ কার্যক্রমের অর্ধেক খরচ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। তবে লোকেক বলেন, যদিও তারা বড় দাতার ভূমিকা পালন করছে তারপরও তাকে বলতেই হবে যে, তাদের সামরিক অভিযান ইয়েমেনের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যে রেকর্ড তৈরি করেছি তা নিজেই কথা বলবে। নির্যাতন ও নৃশংসতা নিয়ে আমি ধারাবাহিক বিবৃতি দিয়েছি যাতে সব বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য