লালমনিরহাটে হাতুড়ির আওয়াজে মুখরিত কামার শালাগুলোআজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধি: কোরবানির ঈদের আর মাত্র দু’দিন বাকি। কামারপাড়ায় কারিগরদের ঠুন ঠান শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার কর্মকার সম্প্রদায়ের শিল্পীরা।

ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিরলসভাবে দা, ছুরি ও বটি তৈরি এবং মেরামতের কাজ করে চলেছেন। কোরবানির আগেই ক্রেতার হাতে এসব ধারালো অস্ত্র তুলে দিতে হবে। তাই কোনো বিশ্রাম পাচ্ছেন না তারা। সারা বছরই প্রত্যেক বাড়িতে দা, বটি, ছুরির মতো যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়। এসব জিনিসের চাহিদাও থাকে সব সময়। কোরবানির ঈদ এলে এ চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। শুধুমাত্র ঈদেই এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগর ও ব্যবসায়ীরা একটু ব্যবসা করার আশা করে থাকেন। পশু কোরবানির জন্য অতি প্রয়োজনীয় বটি, চাপাতি, ছুরি ও কোপা কিনতে এখন সকলেই ছুটছেন কর্মকারের কাছে। আর এতেই এক মাসে পেশাটি বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর কোরবানি ঈদের সময়ই হাসি ফুটে ওঠে জীবন যুদ্ধের কষাঘাতে জর্জরিত এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোর মুখে।

ওই শিল্পের কারিগররা ক্ষোভ নিয়ে বলেন, সারা বছর আমাদের অনেক কষ্ট করে চলতে হয়। কর্মকারদের তৈরি জিনিষের চাহিদা এখন আর আগের মতো নেই। শুধুমাত্র কোরবানির ঈদ এলেই কামারপাড়ায় ভিড় আর কর্মব্যস্ততা বাড়ে। তারপরও বাপ-দাদার পেশাকে আঁকড়ে ধরে কোনো রকম বেঁচে আছি।

কালীগঞ্জের চৌধুরী বাজার, কাকিনা বাজার, শিয়ালখোওয়া, চাঁপারহাট, চামটারহাট, ভুল্ল্যারহাট কামারের কারখানা ঘুরে দেখা গেছে এসব তৈরিতে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া লাগেনি। পুরানো নিয়মেই চলছে সকল কাজ। কামাররা কয়লার দগদগে আগুনে লোহাকে পুড়িয়ে পিটিয়ে তৈরি করছেন দা, ছুরি বটি, কোপাসহ ধারালো কর্তন সামগ্রী। বর্তমানে প্রতি পিস বটি পাইকারি ২৫০ টাকা, খুচরা ৩০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা, চাপাতি পাইকারি ৩৫০, খুচরা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, ছুরি সর্বনিম্ন ৮০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে জবাই করার ছুরি ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

কোরবানির সংখ্যা বাড়ার কারণে কামারদের কর্মব্যস্ততা ও বেচাকেনাও বাড়ছে। তবে কামারপট্রির কারিগর কালীগঞ্জ চৌধুরী বাজারের নওসা কর্মকার অভিযোগ করে বলেন, তাদের পরিশ্রমের তুলনায় মজুরি অনেক কম। সারা দিন আগুনের পাশে বসে থাকতে হয়। ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। তাদের প্রতিদিনের মজুরি ৪০০ টাকা। উর্ধ্বমূখী বাজারে যা কামাই করি তা দিয়ে সংসার চলে না। সরকার এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে বিশেষ সুযোগ সুবিধা চালু করতে হবে।

কাকিনার বাজারের কামার মানিক মোহন্ত কর্মকার বলেন, সারা বছর আমাদের মোটামুটি বিক্রি হয়। তবে এই সময় বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি। সারা বছরই শত শত কামার সম্প্রদায়ের লোক এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় লাভ আগের চেয়ে কম। একই এলাকার বসন্ত কর্মকার জানান, সত্তরের দশকের শুরু থেকেই আমরা বংশ পরস্পরায় উপকরণ তৈরির কাজ শুরু করেছি। দা, বটি, চাপাতি তৈরির কারিগর হিসেবে আমাদের সুখ্যাতি রয়েছে। এ পেশায় অধিক শ্রম দিতে হয়। জীবিকা নির্বাহে কষ্ট হলেও শুধু পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এ পেশাকে তারা এখনো আকড়ে আছেন।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার বিডিয়ার রোড এলাকার কামার অমল্য কর্মকার বলেন, সারা বছর আমাদের মোটামুটি বিক্রি হয়। তবে এই সময় বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি। সারা বছরই শত শত কামার সম্প্রদায়ের লোক এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় লাভ আগের চেয়ে কম।

একই এলাকার হেমন্ত কর্মকার জানান, সত্তরের দশকের শুরু থেকেই আমরা বংশ পরস্পরায় উপকরণ তৈরির কাজ শুরু করেছি। দা, বটি, চাপাতি তৈরির কারিগর হিসেবে আমাদের সুখ্যাতি রয়েছে। এ পেশায় অধিক শ্রম দিতে হয়। জীবিকা নির্বাহে কষ্ট হলেও শুধু পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এ পেশাকে তারা এখনো আকড়ে আছেন।

হাতীবান্ধা বাজারের কামার শহিদুল ইসলাম জানান, আমরা দা, বটি, চাপাতি, ছুরিসহ লোহা ও ইস্পাত দিয়ে নানা সরঞ্জাম তৈরি করি। জেলাতে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়।

ওনার দোকানে আসা বটি কেনার জন্য গৃহিনী লাবনী সরকার বলেন, আমার পুরাতন একটি হাসুয়া ও দা ধার দেয়ার জন্য এখানে আসা। তাছাড়া একটি নতুন বটি কিনবো। কোরবানীর ঈদতো তাই এগুলো কেনা খুবই জরুরী। সব মিলিয়ে ঈদ আসলেই লৌহ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েকগুন।

কাকিনা উত্তরবাংলা ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ এএসএম মনওয়ারুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় সীমান্ত জনপদের মানুষের এখন জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এসেছে। উন্নতিও হয়েছে। তাই এই জনপদে এবার কোরবানির সংখ্যাও অনেক বাড়বে বলে তিনি আশা করেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য