মাসুদ রানা পলক, ঠাকুরগাঁও।। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের পশ্চিম পারপুগি গ্রামের ফাহমিদা আক্তার (মামনি) নামে এক গৃহবধূর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।

মেয়েটির পরিবারের দাবী , এটি যৌতুকের জন্য স্বামী ও স্বামীর পরিবার তাকে হত্যা করেছে। এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় একটি হত্যা মামলা হলে পুলিশ ১ জন আসামীকে গ্রেফতার করে।

গত বুধবার সন্ধ্যা ৬ টার সময় এই ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেশিরা জানান। মৃত ফাহমিদা আক্তার (মামনি)-কে স্বামীর বাড়িতে হত্যা করা হয়েছে বলে তার বাবা মায়ের দাবী। এই বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় ফাহমিদা আক্তার (মামনি)’র মা রসবা বেগম বাদী হয়ে তার স্বামী আব্দুল হান্নান (রুপাই)-কে ১নং আসামি গৃহবধুর শ্বশুর আব্দুল জলিল (৫৫), দেবর উজ্জল (২৮), জা মনোয়ারা বগম (৩০), যা শারমিন বেগম (২২), নবী (৩২), মান্নান (৪৫)। পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে দেবর উজ্জলের স্ত্রী শারমিনকে গ্রেফতার করে। মোট ৭ জনের নামে একটি চলমান মামলা করা হয়েছে।

বাবা-মা সুত্রে জানা যায়, প্রায় ১২ বছর পুর্বে ফাহমিদা আক্তার (মামনি) ও ঠাকুরগাঁও সদর থানার মহেশালি গ্রামের আব্দুল হান্নান (রুপাই) এর ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে হয়। তাদের দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে রিয়ার বয়স ৮ বছর ও ছোট মেয়ে সিয়ার বয়স ২ বছর। মামলার এজাহার ও মামনির পরিবার সুত্রে জানা যায় , বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য আব্দুল হান্নান (রুপাই) সহ তার পরিবারের লোকজন ফাহমিদা আক্তার (মামনি)’র উপর অমানবিক অত্যাচার করত বলে।

এ নিয়ে এলাকায় উভয় পরিবারের মধ্যে একাধিকবার চেয়ারম্যান, মেম্বারের মাধ্যমে বিচার ও সালিশ হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত রমজান মাসের আগে ফাহমিদা আক্তার (মামনি)-কে তার শশুর বাড়ি থেকে বের করে চেয়ারম্যানের হাওলায় রাখে বলে জানা যায়। কিছু দিন পরে এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বারের মাধ্যমে আবার ফাহমিদা আক্তার (মামনি)-কে তার স্বামীর বাড়িতে পাঠানো হয়। কিন্তু তার পরেও ফাহমিদা আক্তার (মামনি)’র উপর জুলুম অত্যাচার কমেনি। পুলিশের ধারণা জুলুম অত্যাচারের এক পর্যায়ে মামনি আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে। আর বাবা মা ও এলাকাবাসির অভিযোগ তাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, মৃত্যুর পর মামনির শরীরের বিভিন্ন জায়গায় (মুখে, মাথায়, গলায়, পায়ে ও বুকে) নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়।

ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সুত্রে জানা যায়, মেয়েটি বিষাক্ত কিছু খেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে এসেছিল। আমরা তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে ভর্তি করে নেই। এর কিছুক্ষণ পরেই তার মৃত্যু হয়।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জামালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের সাথে কথা বললে তিনি জানান, এই পরিবারটির বিয়ের পর থেকেই ঝগড়া-ঝাটি লেগেই ছিল। আমি ও আমার মেম্বার একাধিকবার বিচার সালিশি করেছি। মৃত্যুর দিন সকাল ১০ টায় সে আমাকে ফোনে তার স্বামীর নামে অভিযোগ করেছিল।

এলাকাবাসির সাথে কথা বলে জানা যায়, ফাহমিদা আক্তার (মামনি)-কে অমানবিকভাবে অত্যাচার করার পর তার স্বামী সহ পরিবারের লোকজনেরা তাকে হত্যা করে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে আসে। কিন্তু তার স্বামী হাসপাতালে ভর্তির সময় বিষ খাওয়ার কথা বলে ভর্তি (চিকিৎসা) করায়।

পরে মেয়ের মা থানায় এজাহার করলে কর্তব্যরত অফিসার হাসপাতালে এসে মৃত’র সুরতহাল রিপোর্ট করে লাশ ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠান। ময়না তদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার বিকালের দিকে মৃত মামনির লাশ তার বাবার বাড়িতে নিয়ে গেলে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর আমাদের প্রতিনিধি সেখানে গিয়ে তার মায়ের সাথে কথা বলতে গেলে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, “আমার মেয়েকে ওরা মারে ফেলাইছে”। একথা বলার পর তিনি অজ্ঞান হয়ে পরেন। এছাড়াও ফাহমিদা আক্তার (মামনি)’র বাবা, ভাই, মামাত বড় ভাই সহ এলাকার গণ্যমান্য লোকজনের সাথে কথা বললে সবাই একই কথা বলে যে, তাকে হত্যা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর থানার তদন্ত অফিসার (ওসি) রওশন আরা বলেন, অভিযোগ পেয়েছি এবং ১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মৃতের স্বামী সহ বাকিরা সবাই পালাতক রয়েছে। সুরতহাল ও ময়না তদন্ত হয়েছে। পরবর্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে বৃহষ্পতিবার রাত ১০ টায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কফিল উদ্দিন টেলিফোনে বলেন, অন্যান্য আসামীদেরও ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে , তবে তারা পলাতক রয়েছেন বলে তিনি জানান

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য