গাইবান্ধা তৃষা হত্যাকান্ডে পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবারকে সহানুভূতি ও উপহার প্রদানআরিফ উদ্দিন, গাইবান্ধা থেকেঃ দেশে-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারি গাইবান্ধার তৃষা হত্যাকান্ড স্মরণে জেলা পুলিশ বুধবার পুলিশ সুপার সম্মেলন কক্ষে ব্যতিক্রমধর্মী এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গাইবান্ধার পুলিশ সুপার প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান মিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তৃষা হত্যাকান্ডের ঘটনা স্মৃতিচারণ করা হয় এবং তার পিতা-মাতাকে পুলিশের পক্ষ থেকে সহানুভূতি জানানোর পাশাপাশি তৃষার ছোট্ট বোন আল সাবিল তৃনাকে তার স্কুলে যাতায়াতের জন্য একটি বাই-সাইকেল উপহার দেয়া হয়। উল্লেখ্য, তৃনা স্থানীয় স্নিগ্ধ জ্ঞানের আলো বিদ্যাপীঠের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী।

অনুষ্ঠানে তৃষার বাবা আব্দুস সাত্তার ও মা আলেমা বেগম এবং সেসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রক্ষাকারি গাইবান্ধার পৌর কাউন্সিলর তৃষার আত্মীয় আমাতুর নুর ছড়া আবেগতাড়িত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন। এসময় তার ছোট ভাই ইয়াসির আরাফাত আকাশও উপস্থিত ছিল। সে এই ঘটনার সময় প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিল।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্যাহ আল ফারুক, গাইবান্ধা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর সাবু, যুগ্ম সম্পাদক আবেদুর রহমান স্বপন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গাইবান্ধা ডিবি পুলিশের অফিসার ইনচার্জ মেহেদী হাসান, সদর থানার অফিসার ইনচার্জ খান মো. শাহরিয়ারসহ বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।

পুলিশ সুপার প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান মিয়া তৃষার এই দুঃখজনক ও মর্মান্তিক ঘটনাকে স্মরণ করে পরিবারের সবার প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন এবং ঘটে যাওয়া এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন, গাইবান্ধার পুলিশ খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, জুয়া, মাদক ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করে গাইবান্ধায় সার্বিক শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই জেলায় এ ধরণের মর্মান্তিক কোন ঘটনা ঘটার ন্যুনতম সুযোগ নেই। কেননা শুধু শান্তি শৃঙ্খলাই নয়, এই জেলায় পুলিশ জনকল্যাণে নিবেদিত থাকতে চায়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, গাইবান্ধা জেলা শহরের ভিএইড রোডের আব্দুস সাত্তার ও আলেমা বেগমের প্রথম কন্যা ফুটফুটে একটি সাবিহা সুলতানা তৃষা। যে ছিল মধ্যপাড়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ২০০২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর স্কুল ছুটি হওয়ার পর বিকাল সাড়ে ৪টায় বাড়ি ফেরার পথে সে খাঁপাড়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকার তিন বখাটে যুবক মডাণ, আশা ও শাহীন তার পথরোধ করে উত্যক্ত করে এবং টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ অবস্থায় সুযোগ বুঝে সে আত্মরক্ষার্থে স্কুলের বই খাতা নিয়েই ছুটতে শুরু করে। এ পর্যায়ে ওই বখাটেরা ধর্ষণের উদ্দেশ্যে তাকে পাকড়াও করতে ধাওয়া করে।

দৌড়াতে দৌড়াতে সামনে পুকুর পাড়ে চলাচলের পথ শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থায় তিনদিকে তিন দুর্বৃত্ত যুবক তাকে ঘিরে ফেলে। এসময় সাঁতার না জানা ভয়ে তৃষা এবং তার সম্ভম রক্ষায় পুকুরে ঝাপ দেয়। এসময় পুকুরের গভীর পানিতে পড়ে হাবুডুবু খেতে থাকে তৃষা। দু’হাত তুলে জীবন বাঁচাতে সাহায্য কামনা করে। কিন্তু দুর্বৃত্তরা পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে মেয়েটির ডুবে যাওয়া দেখে হাসতে থাকে এবং তার পুকুরে ডুবে যাওয়া নিশ্চিত করে তারা পালিয়ে যায়। এসময় পুকুরে ডুবেই নিহত হয় ফুটফুটে তৃষা। স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা দুর্বৃত্তদের পাকড়াও করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে।

এঘটনায় হত্যার বিচারের দাবিতে গোটা গাইবান্ধার সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সারাদেশ জুড়ে এ ঘটনা ব্যাপক প্রচার পায়। তৎকালিন মিডিয়াগুলো প্রতিদিন এ ঘটনার ব্যাপক প্রচার চালাতে থাকে। ফলে আলোড়ন সৃষ্টিকারি গাইবান্ধার তৃষা হত্যাকান্ড জনদাবিতে পরিণত হয়। তিন বখাটের বিরুদ্ধে মামলা হয় ধর্ষণের উদ্দেশ্যে হত্যা। জেলা বিচারক তিনজনকেই ফাঁসির আদেশ দেন। মামলাটি ডেথ রেফারেন্স কোর্টে আসে। হাইকোর্ট তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। এরপর আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল করেন। আপিল বিভাগ আসামিদের ১৪ বছরের সাজার রায় দেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য