রাখাইনের উন্নয়নে অংশ নিতে চায় থাইল্যান্ড, নরওয়ের সহযোগিতা কামনারোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও সংঘাতপূর্ণ রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নে একটি প্রকল্প পরিচালনার জন্য নরওয়ের কাছ থেকে সহযোগিতা চেয়েছেন থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সিঙ্গাপুরে ৫১-তম আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ অনুরোধ জানান তিনি। থাইল্যান্ডের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান এরইমধ্যে বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইনে বিদেশি সহায়তাকে অগ্রাহ্য করার কোনও পরিকল্পনা সরকারের নেই। কেবল রাখাইনে সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যই নয়, গোটা দেশকে সহায়তা প্রদান ও স্থানীয়দের কর্মসংস্থান তৈরির দিকে মনোযোগী হতে হবে। মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতীর এক প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ বছরের মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে জানায়, নিধনযজ্ঞের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা পালিয়ে যাওয়ার পর তাদের ফেলে আসা গ্রাম ও জমিজমায় ঘাঁটি তৈরি করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

কোনও কোনও ক্ষেত্রে এখনও ধ্বংস না হওয়া ঘরবাড়ি নতুন করে জ্বালিয়ে দেওয়ারও আলামত মিলেছে। এক বিবৃতিতে ওই সময় সংস্থাটির সংকট মোকাবিলাবিষয়ক পরিচালক তিরানা হাসান অন্তত ৩টি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ চলমান থাকার কথা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে স্থাপনা ও রাস্তাঘাট নির্মাণের কাজ চলার কথাও জানা গিয়েছিল তখন। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে সামরিক সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট সোফরেপও একই অভিযোগ করেছিল।

মিয়ানমারের দরিদ্রতম রাজ্যগুলোর একটি রাখাইন। তবে এখনও রাজ্যটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। কৃষি, মৎস ও জ্বালানি খাতে সফলভাবে বিনিয়োগের সম্ভাবনা আছে সেখানে। অনেক বিদেশি কোম্পানি এরইমধ্যে সেখানকার পেট্রোলিয়াম ও অফশোর প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রে বিনিয়োগ করেছে।

থাইল্যান্ড সরকারও রাখাইনে একটি উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা করতে চায়। থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডন প্রামুদউয়িনাই বলেছেন, এ প্রকল্প একইসঙ্গে সরকার ও স্থানীয়দের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সুবিধা দেবে। সিঙ্গাপুরে আসিয়ানের মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের ফাঁকে শনিবার (৪ আগস্ট) ডন প্রামুদউয়িনাই নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইনে ম্যারি এরিকসেন স্রেইডের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। আসিয়ানের ওয়েবসাইটে দেওয়া সংবাদ বিবৃতি থেকে জানা যায়, বৈঠকে থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী নরওয়েকে প্রকল্পে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। থাইল্যান্ড আশা করে, নরওয়ে এ প্রকল্পে যোগ দেবে। এ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে, জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত প্রকল্প, কমিউনিটিভিত্তিক উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষা সংক্রান্ত পরিকল্পনা।

রাখাইন রাজ্যে কিয়াউকফিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর নেওয়া বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীনের সঙ্গে ৭০টি দেশের বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগের পথ নির্মাণ করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিনিয়োগকারীদেরকে আকৃষ্ট করতে মিয়ানমার সরকার ও থাইল্যান্ডভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব বিজনেস ইকোনমিক রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইবিইআরডি) একটি পাইলট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। গত মাসে নেপিদোতে তারা কয়েকটি বৈঠকও করেছে। সরকার ও আগ্রহী ডেভেলপারদের মধ্যে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক সুবিধা সংক্রান্ত পরামর্শক হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে আইবিইআরডি।

মিয়ানমারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও রাখাইন রাজ্য সংক্রান্ত সুপারিশ বাস্তবায়নে নিয়োজিত কমিটির প্রধান উ উয়িন মিয়াত আয়ে ইরাবতীকে বলেন, রাখাইন রাজ্যের জন্য বিদেশি সহায়তাকে অগ্রাহ্য করার কোনও পরিকল্পনা মিয়ানমারের নেই। তবে নরওয়েকে এ প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি।

উ উয়িন মিয়াত বলেন, ‘কেবল রাখাইনে সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যই নয়, গোটা দেশকে সহায়তা প্রদান করা এ অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার লক্ষ্য। যারাই এ এলাকায় বিনিয়োগ করতে চায়, তাদেরকে স্থানীয় জনগণের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির দিকে মনযোগী হতে হবে।’

উ উয়িন মিয়াত আয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, রাখাইন সোশিও-ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি থাইল্যান্ডের একটি অর্থনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করছে। বিনিয়োগ সুবিধা নিয়ে গবেষণা করতে থাইল্যান্ড সম্প্রতি রাখাইনে একটি দল পাঠিয়েছে। মৎস ও যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে থাইল্যান্ডের।

উ উয়িন মিয়াত আয়ে বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নে যুক্ত হওয়া দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। তবে সব বিদেশি রাষ্ট্রের জন্য আমাদের নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে। এই নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই আমরা প্রত্যেকটি দেশের বিনিয়োগ গ্রহণ করব।’

চীন ও জাপানও রাখাইন রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানান উ উয়িন মিয়াত।

ইরাবতীর প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইন রাজ্য নিয়ে সহযোগিতা প্রশ্নে থাইল্যান্ডের আমন্ত্রণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি নরওয়েও।

প্রথম কোনও আন্তর্জাতিক দেশ হিসেবে মিয়ানমারের অস্ত্রবিরতি চলমান থাকা রাজ্যগুলোতে উন্নয়ন ও মানবিক প্রকল্পে অর্থায়নের মধ্য দিয়ে চলমান শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছিল নরওয়ে। দেশটির কোম্পানিগুলো মিয়ানমারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপও জোরালো করেছে নরওয়ে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য