জিম্বাবুয়েতে সহিংসতা সংযত হওয়ার আহ্বান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরসাধারণ নির্বাচনের ফল মেনে না নিয়ে প্রতিবাদ জানানো বিরোধীদের ওপর জিম্বাবুয়ে সরকারের শক্তি প্রদর্শন ও একে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার পর সব পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

সোমবারের নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

জাতিসংঘ এবং জিম্বাবুয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে ঔপনিবেশিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে ছিল সেই যুক্তরাজ্যও দেশটির নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে।

১৯৮০ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা রবার্ট মুগাবেকে উৎখাতের পর অনুষ্ঠিত প্রথম এ পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জানু পি-এফ বেশিরভাগ আসনে বিজয়ী হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ফলে দেখা গেছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা দল জানু-পিএ এবারের নির্বাচনে জিততে কারচুপির আশ্রয় নিয়েছে।

পার্লামেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি সোমবার দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট ও স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তা নির্ধারণেও ভোট হয়েছে।

দুইদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও নির্বাচন কমিশন (জেডইসি) প্রেসিডেন্ট পদে কে বিজয়ী হয়েছে তা জানাতে না পারলেও বিরোধী মুভমেন্ট ফর ডেমোক্রেটিক চেইঞ্জ (এমডিসি) জোট বলছে, তাদের প্রার্থী নেলসন চামিসাই ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এমনানগাওয়াকে পরাজিত করেছে।

প্রায় চার দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা মুগাবেকে উৎখাতের পর এমনানগাওয়াই প্রেসিডেন্টের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

জেডইসির ঘোষিত ফলে নিম্নকক্ষের ২১০ আসনের মধ্যে জানু-পিএফ বেশির আসনে বিজয়ী হয়েছে জানানোর পরই রাজধানী হারারেতে বিক্ষোভ শুরু হয়; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করে।

বিক্ষোভকারীদের পাথর ছুড়ে মারার প্রতিক্রিয়ায় সেনাবাহিনী গুলি ছুড়লে অন্তত তিনজন নিহত হয় বলে জিম্বাবুয়ে পুলিশের বরাত দিয়ে জানিয়েছে রয়টার্স।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওবার্ট এমপফু বলেছেন, তার সরকার এ ধরনের প্রতিবাদ ‘বরদাশত করবে না’।

“বিরোধীরা আমাদের দৃঢ়তার পরীক্ষা নিচ্ছে, আমার ধারণা তারা বড় ধরনের ভুল করছে,” বলেছেন তিনি।

এমডিসি জোটের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী চামিসার এক মুখপাত্র বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনী মোতায়েন ও সহিংসতায় নিহতের জন্য সরকারকে অভিযুক্ত করেছেন।

“সৈন্যরা যুদ্ধের সময় হত্যা করার জন্য প্রশিক্ষিত, বেসামরিক নাগরিকরা কি এদেশের শত্রু? আজ যে ধরনের বর্বরতা আমরা দেখেছি কোনোভাবেই তার কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে না,” বলেছেন তিনি।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জিম্বাবুয়ের রাজনীতিবিদদের সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সহিংসতায় গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হ্যারিয়েট বল্ডউইন।

সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য জিম্বাবুয়ের ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ আছে মন্তব্য করে হারারের মার্কিন দূতাবাস টুইটারে দেশটির সেনাবাহিনীকে ‘সংযত আচরণের’ অনুরোধ জানিয়েছে।

মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড তদন্তে জিম্বাবুয়ের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

“নির্বাচন পরবর্তী সামরিকায়ন মত প্রকাশ, সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতাকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। জনগণের প্রতিবাদ জানানোর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে,” এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন অ্যামনেস্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কোমও কুনাচেইন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল ঘোষণার দেরির সমালোচনা করেছেন। ফল ঘোষণার জন্য জেডইসির হাতে রোববার পর্যন্ত সময় আছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সবার জন্য লেভেল-প্লেয়িং ফিল্ড সমান না হওয়া, আস্থার ঘাটতি, গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্ব, ভোটারদের ওপর হস্তক্ষেপ, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে অবিশ্বাসসহ নির্বাচনকেন্দ্রীক বেশ কিছু সমস্যা খুঁজে পাওয়ার কথাও বলছেন ইইউ পর্যবেক্ষকরা।

১৬ বছর পর এবারই জিম্বাবুয়ের কোনো নির্বাচনে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষকরা প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন।

আফ্রিকান ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচন বেশ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রার্থীদের মধ্যে ‘তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।

ভোট কেনা, রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এবং পুরনো নেতাদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের যে অভিযোগ বিরোধীরা করেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছে তারা।

সাউদার্ন আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট কমিউনিটির (এসএডিসি) প্রাথমিক প্রতিবেদনেও সোমবারের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও আইন অনুযায়ী হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেডইসি এখন পর্যন্ত ঘোষিত ফলে জানু-পিএফ ১৪০টি এবং এমডিসি ৫৮টি আসনে জয়ী হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জেডবিসি।

মুগাবেবিহীন এ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য ৫০ লাখেরও বেশি নাগরিক নিবন্ধন করেছিলেন, ভোট পড়ার হার ছিল ৭০ শতাংশের বেশি।

বুধবার স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১২টার দিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল জানানোর কথা থাকলেও নির্বাচন কমিশন কেবল নিম্নকক্ষের আংশিক ফলই ঘোষণা করে। প্রার্থীদের প্রতিনিধিরা ভোটের ফল যাচাই করতে না পারায় প্রেসিডেন্ট পদের ফলাফল প্রকাশে দেরি হচ্ছে বলে বিবিসির প্রতিনিধি জানিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট হতে হলে প্রার্থীকে অবশ্যই ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেতে হবে; কোনো প্রার্থী এ পরিমাণ ভোট না পেলে ৮ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফার ভোট হবে। সেখানেই নির্ধারিত হবে, কে হচ্ছেন জিম্বাবুয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য