বড়পুকুরিয়া কয়লা দূর্ণীতি ও  চুরির ঘটনা নতুন নয়ষ্টাফ রির্পোটারঃ দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কয়লা দুর্ণীতির ঘটনা নতুন নয়, ইতোপুর্বেও কয়েক দফা দুর্ণীতি ও দুরির ঘটনা ঘটলেও তা আজো আলোর মুখ দেখেনি। একাধিক দুর্ণীতি ও চুরির ঘটনায় মামলা হলেও উম্মোচন হয়নি রহষ্য, বরাবরে ধরাছোয়ার বাহিরে থেকে মুল হোতারা।

খনি এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে দুর্ণীতি ও চুরি শুরু হয় ২০০৬ সাল থেকে, প্রথম অবস্থায় টেন্ডার বাজি, কমিশনের বিনিময় খনির প্রয়োজনয়ি মালামাল সরবরাহকারী নিয়োগ ও খনির মূল্যবান সম্পদ বাজারদর উপেক্ষ অনেক কমদামে বিক্রি। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোকশান হলেও, খনির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও তাদের আস্থাভাজন ব্যাক্তিরা এই ব্যবস্যা করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। গত ১০/১৫ বছর পুর্বে যারা কোটি টাকার চিন্তাও করতে পারেনি, সেই ব্যাক্তিরা এখন কোটিপতি হিসেবে পরিচিত।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে প্রথম চুরির ঘটনা ঘটে ২০১০ সালে। সে সময় দুই কোটি টাকার তামা চুরির ঘটনা ঘটে। এই চুরির ঘটনায় মুল হোতাদের আড়াঁল করে, গোলাম মোস্তাফা নামে এক (তৃতীয় পক্ষের অধিনে কর্মরত) কর্মচারীর নামে মামলা দায়ের করে খনি কতৃপক্ষ। উচ্চ আদালতে সেই মামলা থেকে গোলাম মোস্তফা নির্দোষ হিসেবে ছাড়া পেলেও, তামা চুরির ঘটনাটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

একই ভাবে গত ২০১৬ সালে ব্যাংক চালান জালিয়াতি করে ৩০০ মেটন কয়লা পাচার হয়ে যায়। এই ঘটনাটি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ পেলে, খনির চার কর্মকর্তা, তৎকালিন মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসেব) আব্দুল মান্নান পাঠোয়ারী, উপ-মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসেব) গোপার চন্দ্র সাহাসহ চার কর্মকর্তাকে সাময়িক ওএসডি করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এরপর রাতারাতি ৩০০ টন কয়লার মুল্য ব্যাংকে জমা দিয়ে সেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়া হয় ও সাময়িক ওএসডি করা কর্মকর্তাদের স্বপদে বহাল করা হয়। এরপর গত ১৯ জুলাই খনি থেকে এক লাখ ৪৪ হাজার মেটন কয়লা উধাও এর ঘটনা ঘটলো।

শুধু সাংবাদিকদের নিকটই অভিযোগ নয়, খনির দুর্ণীতিবাজ কর্মকর্তার ছবি এখন ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, খনিতে দির্ঘদিন চাকুরি করার কারনে কয়েকজন দুর্ণীতিবাজ কর্মকর্তার নাম। এলাকাবাসীরা বলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা বদল হলেও দীর্ঘদিন ধরে কয়লা খনিতে চাকুরী করার সুবাধে আবুল কাশেম প্রধানীয়া গড়ে তুলেছিলেন বড় ধরনের সিন্ডিকেট। সব ধরনের কাজের কর্তা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি।

আর সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদও দীর্ঘদিন চাকুরী করেছেন এখানে। তিনি খনিতে উপ-ব্যবস্থাপক হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করার পর পর্য্যায়ক্রমে পদোন্নতি পেয়ে উপ-মহাব্যবস্থাপক, মহাব্যবস্থাপক ও পরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পদ্যোন্নতি পান। একইসাথে দুর্ণীতির বড় অভিযোগ রয়েছে খনির ব্যবস্থাপক (জেনারেল সার্ভিসেস) মাসুদুর রহমান হাওলাদার ও মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) গোপাল চন্দ্র সাহার নাম।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির দক্ষিণ দিকে কথা হয় কয়লার ডাষ্ট ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন। তিনি জানান, দীর্ঘ ৮ বছর ধরে চাকুরী করেছেন কোম্পানী সচিব ও মহাব্যবস্থাপক আবুল কাশেম প্রধানীয়া। যতসব নাটের গুরু তিনিই। কয়লা সরবরাহ, ব্যবস্থাপনা, চাকুরী দেয়াসহ খনির যাবতীয় কার্যক্রম হতো তার ইশারায়। আবুল কাশেম প্রধানীয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই কয়লার খোজ পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।

শুধু আবুল কাশেম প্রধানীয়াই নয়। দীর্ঘদিন এই খনিতে চাকুরী করেছেন সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদ। এক সময়ে তিনি এখানকার উপ-ব্যবস্থাপক থেকে মহাব্যবস্থাপক ছিলেন। তখন থেকেই কয়লা ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে তার। পরবর্তীতে তিনি এখানকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান।

কয়লা দূর্ণীতির সাথে যাদের নাম সবচেয়ে বেশি রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন খনির ব্যবস্থাপক (জেনারেল সার্ভিসেস) মাসুদুর রহমান হাওলাদার ও মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) গোপাল চন্দ্র সাহার নাম। দূর্নাম থেকে বাদ যাননি সাময়িক বরখাস্তকৃত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুর-উজ-জামান চৌধুরী, উপ-মহাব্যবস্থাপক (স্টোর) একেএম খালেদুল ইসলাম।

এদের মধ্যে মাসুদুর রহমান এই কয়লা খনিতে চাকুরী করা কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষমতাধর ছিলেন বলে অনেকেই জানিয়েছেন। শ্রমিকদের আন্দোলন-সংগ্রামে মারধোর করার অভিযোগও রয়েছে তার নামে। আর গোপাল চন্দ্র সাহার বিরুদ্ধে এর আগেই ২০১৬ সালে ৩০০ টন কয়লা চুরির অভিযোগ ছিল।

তিনি জানান, খনির বিদায়ী কোম্পানী সচিব ও মহাব্যবস্থাপক আবুল কাশেম প্রধানীয়া দীর্ঘদিন ধরে চাকুরী করার সুবাধে তিনি বিভিন্ন লোকজনের সাথে আতাত করে দূর্ণীতির পাহাড় গড়ে তুলেছেন। আবুল কাশেম প্রধানীয়ার জন্মস্থান চাঁদপুর জেলায়। তবে ঢাকার কেরানীগঞ্জে বহুতলা ভবন ও পরীবাগে একটি বাড়ী রয়েছে তার। একটি পেট্রোল পাম্পও আছে যা স্ত্রী ও শ্বাশুড়ীর নামে করা।

একইভাবে ক্ষমতাধর হিসেবে পরিচিত মাসুদুর রহমান হাওলাদারের মাদারীপুরে বিলাশবহুল বাড়ী রয়েছে। ৩/৪টি মাইক্রোবাস রয়েছে যার একেকটির মূল্য অর্ধকোটি টাকারও বেশি করে। এসব মাইক্রোবাস তিনি পরিচালনা করেন দীঘিপাড়া কয়লা খনিতে কর্মকর্তাদের যাতায়াতের জন্য। এজন্য তিনি মোটা অংকের ভাড়া পান।

বড়পুকুরিয়া গ্রামের পলাশ জানান, দূর্নীতি হয়েছে যা তার বেশিরভাগের জন্যই দায়ী আবুল কাশেম প্রধানীয়া। তার আচরণও ছিল খুবই খারাপ। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির অসাধু ব্যবসায়ীদের সাথে আতাত করে তিনি কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন। এতে করে কেউ কয়লা পেয়েছে চাহিদার কয়েকগুন আর কেউ পায়নি এক ছটাকও।

কয়লা খনি থেকে কয়লা চুরির ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের ছবি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন দিনাজপুর জেলা শাখার সাধারন সম্পাদক এসএম নুরুজ্জামান কোম্পানী সচিব আবুল কাশেম প্রধানীয়ার ছবি ফেসবুকে দিয়ে লিখেছেন ‘বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির সুপারম্যান খ্যাত কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক আবুল কাশেম প্রধানিয়া। তাকে নাকি পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানী সিরাজগঞ্জে বদলি করা হয়েছৈ। বদলী নয় কয়লা চোরদের চাকুরীচ্যুত ও কয়লার ডিও বাণিজ্যের হোতাদের আইনের আওতায় আনা হোক’।

তিনি জানান, কয়লা দূর্ণীতির ঘটনায় যেসব কর্মকর্তাদের নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দোষী কোম্পানী সচিব আবুল কাশেম প্রধানীয়া ও সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদ। এই দুই দুর্ণীতিবাজ কর্মকর্তাদের যাতে করে মানুষ চিনে রাখে সেজন্য তাদের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য