রংপুর একই পরিবারের পাঁচ দৃষ্টিহীন একটি পরিবারের পাঁচজন কিভাবে দৃষ্টিহীন হয়ে গেল, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করানোই যাবে না। চোখে অন্ধকার নেমে আসায় পরিবারটি বিবর্ণ হয়ে গেছে। মানবেতর জীবনসংগ্রাম তাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। অনিশ্চিত পথে চলছে তাদের জীবনরেখা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পাঁচ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর দুঃসহ জীবনের গল্প।

রংপুর মেট্রোপলিটন এলাকার হাজিরহাট থানার ১নং ওয়ার্ডের পূর্ব রণচন্ডি ডাক্টারপাড়ার মৃত শহিদুল রহমানের মা মরজিনা বেগম (৭৫), বোন হোসনে আরা (৩৮), বড় ছেলে আব্দুল আহাদ (৩৫), ছোট ছেলে আনিছুল হক এবং কন্যা শাহনাজ পারভীন (২০) এখন দৃষ্টিহীন। অন্যের ওপর ভর করে পথ চলতে হয় তাদের। কিন্তু এ রকমটা ছিল না তাদের আগে। হঠাৎই তারা অন্ধ হয়ে গেছেন।

মৃত শহিদুলের পরিবারের বড় ছেলে সাত ফিট লম্বা আবদুল আহাদ ২০০১ সালে স্থানীয় জাফরগঞ্জ ফাজিল মাদরাসা থেকে দাখিল পাস করেন। একই প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০৩ সালে আলিম, ২০০৫ সালে ফাজিল পাস করেন। ২০০৭ সালে রংপুর ধাপসাতগাড়া কামিল মাদরাসা থেকে পাস করেন কামিল। পাশাপাশি কারমাইকেল কলেজ থেকে তিনি স্নাতক পাস করেন। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া আবদুল আহাদ নিজের পড়ালেখার খরচ চালাতেন অন্যের বাসাবাড়িতে টিউশনি করে। পড়ালেখা শেষেও টিউশনি করেই চলছিল তার সংসার। বিয়ে করেন। সংসার আলো করে আসে মাহফুজা খাতুন নামে এক কন্যা সন্তান। টিউশনির পাশাপাশি ২০০৭ সালে এলাকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে বন্ধু সামসুল আলম, সিদ্দিকুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ৩০ শতক জমি ক্রয় করে প্রতিষ্ঠা করেন মন্থনা মণ্ডলপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষক হিসেবে নিজেকে মানুষ গড়ার কাজে ব্রত করাই ছিল তার লক্ষ্য। লক্ষ্য পূরণে এগোতেও থাকেন তিনি। কিন্তু ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর হঠাৎই চোখের আলো নিভে যেতে থাকে তার। সেদিন থেকে স্কুল থেকেও অঘোষিত ছুটি হয়ে যায় তার।

আবদুল আহাদ জানান, ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর আমার জীবনের আলো নিভে যাওয়ার দিন। ওই দিন স্কুলে থাকার সময় হঠাৎ করেই দোকানের শাটার নেমে যাওয়ার মতো করে আমার ডান চোখের আলো চলে যেতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি নিয়ে আমি ঢাকার বারডেমসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করাই। কিন্তু ডান চোখে আলো আসেনি। চিকিৎসক বলেছেন, এটি বংশীয় গ্লুকোমা রোগ। এটা ভালো হওয়ার মতো নয়। এরপর বাম চেখের আলোও কয়েক মাস পর চলে যায়। এখন আমি দৃষ্টিহীন। অনেক কষ্টে অর্জন করা শিক্ষা এখন আর আমি অন্য কাউকে বিলিয়ে দিতে পারছি না। স্কুল থেকেও বিদায় নিতে হয়েছে। এখন স্ত্রী মারুফা বেগম ও মেয়ে মাহফুজা খাতুনের হাত ধরেই পথ চলি। স্ত্রীর সেলাই মেশিন দিয়ে করা আয়েই কোনো মতে চলছে আমার সংসার। সবই ছিল আমার, এখন কিছুই নেই। চোখের চিকিৎসাও আর করাতে পারছি না। হয়তো এ সুন্দর পৃথিবীকে আর দেখতে পাবো না।

এ পরিবারের ছোট সন্তান আনিছুল প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পাড়ি দিতে পারেনি। আনিছুল ২০০৯ সালে ঢাকায় একটি প্যাকেজিং কোম্পানিতে সামান্য বেতনে চাকরি শুরু করেন। সেই টাকার কিছু অংশ বাড়িতে, কিছু অংশ নিজে খরচ করে ভালোই চলছিল তার জীবন। বছর দু-এক পার না হতেই চোখের পর্দায় নেমে আসে কালো মেঘ। নিভে যেতে থকে আনিছুলের দুই চোখের স্বপ্ন। ২০১১ সালে চাকরিরত অবস্থা দুই চোখ অন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানির লোকজনের সহায়তায় শূন্য হাতে ফিরে আসেন বাড়িতে। এখন মায়ের আঁচলই আনিছুলের ঠিকানা। এ আনিছুল একটা সময় গ্রামের মেঠোপথ ধরে মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন। প্রায় সাত ফিট লম্বা আনিছুল সকাল বিকেল ছুটে যেতেন খেলার মাঠে। সবকিছুই সাজানো ছিল তার। কিন্তু এখন সেই সাজানো জীবনে কিছুই নেই। কষ্টের জীবনে একজন সঙ্গী পেতে ২০১৩ সালে বিয়ে করেছিলেন আনিছুল। কিন্তু বেশি দিন থাকেননি স্ত্রী। এক বছরের মাথায় ভেঙ্গে যায় আনিছুলের সংসার। বর্তমানে চোখের আলো হারানো কর্মহীন আনিছুলের সারা দিন কাটে বাড়িতে বসে। বাড়ির সামনে চেয়ারে বসে থাকেন দিনের বেলা। আর রাতে কাটান বিছানায়। সামর্থ্যবান এ যুবক এখন কর্মহীন। কেউ তাকে কাজে নেয় না। তার চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্যও নেই পরিবারের।

মৃত শহিদুল ইসলামের যুবতী মেয়ে শাহানাজ পারভীন। অন্যদের মতোই জীবন উচ্ছল ছিল তার। গ্রামের কাদা মাটিতে হেসে খেলে বাড়ন্ত মেয়েটি খুব মেধাবী। স্থানীয় হরকলি ফাজিল মাদরাসা থেকে ২০১২ সালে অষ্টম শ্রেণি পাস করেন তিনি। দাখিল পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার সময় তার চোখের আলো নিভে যেতে থাকে। এখন তিনি দৃষ্টিহীন। পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়িতেই বসে থাকেন সব সময় সময়। বাবাহারা এ বিবাহযোগ্য মেয়েটির পুরো ভবিষ্যৎই এখন অন্ধকার। অনেক চেষ্টা করেও তাকে কোথায় বিয়ে দিতে পারেননি তার পরিবার।

আবদুল আহাদ, আনিছুল ইসলাম এবং শাহনাজ পারভীনের মা রমিছা বেগম জানালেন, আমার চারটি ছেলে মেয়ের মধ্যে এখন ছোট ছেলে শরিফুল ইসলামের চোখই ভালো আছে। সে ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। ঘরে আমার দৃষ্টিহীন বিবাহযোগ্য মেয়ে। একমাত্র ভালো থাকা ছেলের আয় এবং অন্যের বাড়িতে কাজ কর্ম করে পাওয়া আমার আয় দিয়েই সংসার চালাতে হচ্ছে। এদের ভালো চিকিৎসা করার সামর্থ্য নেই। তিন বেলা খাবো সেই সামর্থ্যই নেই। মেয়েটাকে বিয়ে দেই কিভাবে। চরম সঙ্কটে থাকা এ মমতাময়ী মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার কর্মঠ, মেধাবী ছেলে মেয়েরা তো এ রকম ছিল না। তারা সমাজে সবার কাছে প্রিয় ছিল। এখন দৃষ্টিহীনতার কারণে তারা একঘরে হয়ে গেছে। আমি কী করব ভেবে পাই না। আল্লাহর ওপর ভরসা করেই ওদের নিয়ে পথ চলছি। বিত্তবান মানুষ এবং সরকারের কাছে দৃষ্টিহীন তিন ছেলেমেয়ের পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানিয়েছেন এই মমতাময়ী মা।

এদিকে মৃত শহিদুলের বোন হোসনে আরা বেগম। ২০০৮ সালে চোখের আলো থাকাতে বিয়ে হয়েছিল পানাপুকুর এলাকার আবুল কালাম আজাদের সাথে। দুই মাসের সংসার যেতে না যেতেই এক চোখের আলো নিভে যায় শাহনাজের। অন্ধত্বের কারণে আর সংসার টেকেনি তার। ফিরে আসতে হয় মায়ের কাছে। মা মর্জিনা বেগমও (৭৫) অন্ধ হয়ে গেছেন। লাঠিতে ভর করে অন্যের সহায়তায় পথ চলেন। বাধ্য হয়ে স্থানীয় আকিজ কোম্পানির বিড়ি ফ্যাক্টরিতে স্বামী পরিত্যক্তা হোসনে আরা শ্রমিকের চাকরি নেন। অন্যের সহায়তায় সেখানে গিয়ে কাজ করেন। এভাবেই চলছে মা ও মেয়ের সংসার।
এলাকাবাসী মাহবুবুল ও আবদুল হক জানান, বর্তমানে এ পরিবারের পাঁচজন সদস্য দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন। এটা তাদের বংশগত রোগ। তাদের বাড়িভিটে ছাড়া আর কিছু নেই। এলাকার বিভিন্ন লোকজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এ পরিবারকে মাঝে মধ্যে কিছু আর্থিক সহযোগিতা দেয়, সেটা দিয়েই কোনো মতে তাদের সংসার চলছে।

অন্য দিকে মাদরাসা শিক্ষক হাসান আলী জানান, আহাদ, আনিছুল ও শাহানাজ এবং দাদী মরজিনা বেগম এবং ফুফু হোসনে আরা আগে ভালোই ছিলেন। হঠাৎ করেই তারা অন্ধ হয়ে গেছেন। টাকার অভাবে তাদের চিকিৎসাও হচ্ছে না। খেয়ে না খেয়ে সংসার চলছে তাদের। বিশেষ করে শাহনাজ পারভীনের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। ওই মেয়েটিকে নিয়ে ওর মা খুব চিন্তিত অবস্থায় আছে। সরকার ও বিত্তবানরা তাদের পাশে দাঁড়ালে একটি সুন্দর পরিবারে হয়তো আবারো হাসি ফিরে আসতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে রংপুরের বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন অধ্যাপক মো. মোখলেছুর রহমান জানান, রেটিনাইটিস বিগমেন্টটোসা নামে একটি বংশজনিত ডিজিজ আছে চোখের। এটা বংশানুক্রমে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ট্রান্সলেট হয়। এ রোগটির বংশবাহকেরা যুবক বয়সে মোটামুটি চোখে দেখতে পান। কিন্তু পরে তারা আর চোখে দেখতে পান না। ওই পাঁচ ব্যক্তির দৃষ্টিহীনতা যদি বংশানুক্রমিক হয়, তাহলে তাদের চোখে আলো ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আর যদি অন্য রোগ হয় তাহলে তাদের চিকিৎসা করানো যেতে পারে। পরিবারটি যেহেতু দরিদ্র। সরকার কিংবা বিত্তবানরা যদি তাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে চিকিৎসার বিষয়ে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য