রজব আলী, ষ্টাফ রিপোর্টারঃ দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির এক লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা উধাও এর ঘটনায়, আজ বুধবার খনি ও তাপ বিদুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যনসহ ৬ সদস্যর একটি উচ্চতর তদন্ত কমিটি। একই ঘটনায় সদ্য প্রত্যাহার কৃত খনিটির এমডি ও সচিবসহ ১৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে খনি কতৃপক্ষ।

বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিয় কোম্পানী লিঃ (কয়লা খনির) ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আনিছুর রহমান, গতকাল মঙ্গলবার সন্ধায় পার্বতীপুর মডেল থানায় এই মামলা দায়ের করেন।

দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) এবং ৪০৯ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। মামলা নং-৩০। পার্বতীপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাবিবুল হক প্রধান মামলার বিষযটি নিশ্চিত করেছেন।

আমলার আসামীরা হলেন সদ্য প্রত্যহার কৃত খনিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হাবিব উদ্দিন আহম্মদ, কোম্পানী সচিব মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আবুল কাশেম প্রধানিয়া, মহাব্যবস্থাপক মাইনিয় এন্ড অপরেশন (সদ্য মাসয়িক ভাবে বহিস্কৃত) এটিএম নুরুজ্জামান, মহা ব্যবস্থাপক ( অর্থ ও হিসাব) আব্দুল মান্নান পাটোয়ারী, উপ-মহা ব্যবস্থাপক স্টোর (সদ্য বহিস্কৃত) একেএম খালেদুল ইসলাম, উপ-মহা ব্যবস্থাপক (মাইনিয় এন্ড অপরেশন) জোবায়ের আলী, উপ-মহা ব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) গোপাল চন্দ্র সাহা, ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মাসুদুর রহমান হাওলাদার, ব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও নিরাপত্তা) সৈয়দ হাছান ইমাম, ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম, ব্যবস্থাপক অষোক কুমার হাওলাদার, ব্যবস্থাপক আরিফুর রহমান, উপ-ব্যবস্থাপক একরামুল হক, খলিলুর রহমান মোরশেদুজ্জামান, হাবিবুর রহমান, জাহেদুর রহমান, সত্যন্দ্র নাথ বর্ম্মন ও মোশারফ হোসেন। মামলা দায়ের এর ঘটনা নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ফুলবাড়ী সার্কেল) রফিকুল ইসলাম।

এদিকে ঘটনা তদন্ত ও পরিদর্শন করতে বুধবার সকাল ৯ টায় বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে আসেন পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যানের চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্যার নেতৃত্বে ৬ সদস্যর একটি উচ্চতর তদন্ত কমিটি । কমিটির অন্য সদ্যরা হলেন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পেট্রোবাংলা পরিচালক (প্লানিং) আইয়ুব আলী খান, বাংলাদেশ ভূ-তথ্য জরিপ এর সাবেক মহা পরিচালক ডঃ নেহাল উদ্দিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তথ্য ও খনিজ বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডঃ মুশফিকুর রহমান, জ¦ালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) জহুরুল হক ও অতিরিক্ত সচিব (অপরেশন) রতন চন্দ্র পন্ডিত।

তারা বড়পুকুরিয়া ও তাপ বিদুৎ কেন্দ্রটি পরিদশন করেন ও বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সাথে কথাবলেন। এর পর সকাল সাড়ে ১১ টায় তারা খনি থেকে বিমান যোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তবে তারা সাংবাদিকদের সাথে কোন কথা বলতে রাজি হয়নি।

উল্লেখ্য বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উত্তোলন কৃত কয়লার মধ্যে এক লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কাগজ কলমে এক লাখ ৪৬ হাজার টন কয়লা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে আছে মাত্র দুইটন।

এই ঘটনায় গত ১৯ জুলাই বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন ও সচিব আবুল কাশেম প্রধানিয়াকে প্রত্যাহার করে খনিটির নিয়ন্ত্রনকারী প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। একই কারনে খনির মহা-ব্যবস্থাপক (মাইনিং এন্ড অপরেশন) এটিএম নুরুজ্জামান চৌধুরী ও উপ-মহাব্যবস্থাপক (স্টোর) খালেদুল ইসলামকে সাময়িক বহিস্কার করা হয়। এর ৬ দিনের মাথায় খনিটির ১৯জন কর্মকর্তার নামে মামলা দায়ের করে খনি কর্তৃপক্ষ।

এদিকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কয়লা না থাকায় গত ২২ জুলাই থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়েছে বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগওয়াড তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। ফলে উত্তরের আট জেলায় দেখা দিয়েছে বিদ্যুতের ঘাটতি।

মামলায় উল্লেখ করা হয়, খনি উন্নয়নের সময় (২০০১) থেকে ১৯ জুলাই ২০১৮ পর্যন্ত মোট ১ কোটি ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪২ দশমিক ৩৩ মেট্রিক টন কয়লা উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত কয়লা থেকে পার্শ্ববর্তী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৬৬ লাখ ৮৭ হাজার ২৯ দশমিক ২৯ মেট্রিক টন কয়লা সরবরাহ, বেসরকারি ক্রেতাদের কাছে ডিও’র মাধ্যমে ৩৩ লাখ ১৯ হাজার ২৮০ দশমিক ৩৭ মেট্রিক টন কয়লা বিক্রি এবং কয়লা খনির বয়লারে ১২ হাজার ৮৮ দশমিক ২৭ মেট্রিক টন কয়লা ব্যবহার করা হয়।

কয়লার উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার হিসাব করলে ১৯ জুলাই কোল ইয়ার্ডে রেকর্ডভিত্তিক কয়লার মজুদ দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৪৪ দশমিক ৪০ মেট্রিক টন। কিন্তু বাস্তবে মজুদ ছিল প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন কয়লা। আর ঘাটতির পরিমান ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ দশমিক ৪০ মেট্রিক টন কয়লা। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৩০ কোটি টাকা বলে জানানো হয়।

মামলায় আরো বলা হয়, এই ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বাকি ১৫ জন আসামি অনেক আগে থেকেই তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজসে সংঘটিত কয়লা চুরির ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অনুমিত হয়।

মজুদকৃত কয়লার হিসাবের গড়মিলের বিষয়টি দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) এবং ৪০৯ ধারা অনুযায়ী এজাহারভূক্ত করে তদন্ত সাপেক্ষে দোষিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে দায়েরকৃত মামলায়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পার্বতীপুর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) ফখরুল ইসলাম তদন্ত শুরু করেছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য