ইরানে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী তার নাচের ভিডিও অনলাইনে প্রকাশ করলে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ছবি ও ভিডিও বিনিময়ের সামাজিক মাধ্যম ইন্সটাগ্রামে ভিডিও পোস্ট করার দায়ে বেশ কয়েকজন নাগরিককে গ্রেফতার করেছে ইরান।

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একজন তরুণীও রয়েছেন। প্রভাবশালী ওই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নৃত্যরত অবস্থার ভিডিও পোস্ট করার কারণে মায়েদেহ হোজাবরি নামের ওই তরুণীকে গ্রেফতার করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় তার ইন্সটগ্রাম অ্যাকাউন্ট। গ্রেফতারকৃত অপর ব্যক্তিদের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। ইরানের এই পদক্ষেপে সে দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ একে হাস্যকর আখ্যা দিয়েছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, হাতে গোনা কয়েকটি পশ্চিমা অ্যাপস চালু আছে ইরানে। এর মধ্যে বিশ্বের সবথেকে জনপ্রিয় দুই সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক ও টুইটারে প্রকাশিত বার্তা পর্যালোচনা ও কাঁটছাঁট করার পর কেবল তা ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছায়। ফিল্টার করা হয়। আর ইন্সটগ্রাম চালু থাকলেও এর ব্যবহারকারীদের ওপর কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। অনেকের ধারণা, সরকার এই সামাজিক মাধ্যম বন্ধই করে দেবে। সম্প্রতি ইন্সটগ্রামে ভিডিও পোস্ট করার কারণে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে তেহরানের সাইবার পুলিশের প্রধান তৌরাজ কাজেমি বলেন, ইন্সটগ্রামে পপুলার অ্যাকাউন্টগুলো শনাক্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আটক তরুণী মায়েদেহ হোজাবরির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ইন্সগ্রামে তার অ্যাকাউন্টটির ৬ লাখের বেশি ফলোয়ার ছিল। নিজের বেডরুমে গানের তালে তালে নাচ করতে করতে ধারণ করা ভিডিওগুলো ইন্সটগ্রামে পোস্ট করতেন হোজাবরি। হিজাববিহীন নাচের ভিডিও পোস্টকে অপরাধ বলে বিচেনা করছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। অন্য আটককৃতদের হোজাবরিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত যে অনুষ্ঠানে নিয়ে আসা হয়, মানবাধিকারকর্মীদের দাবি মোতাবেক সেই অনুষ্ঠানে হোজাবরি ও অন্য আটককৃতদের কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ প্রায়ই এ কৌশল ব্যবহার করে বলে দাবি তাদের। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সেই অনুষ্ঠানে দেখা গেছে এক নারী ভিডিও করা ও পোস্ট করার কারণ বলতে গিয়ে কান্নারত অবস্থায় কাঁপছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটা মনযোগ আকর্ষণের জন্য করা হয়নি। আমার কতিপয় অনুসারী আছে এবং ভিডিওগুলো তাদের জন্য। এ কাজে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করার ইচ্ছে ছিল না আমার। আমি দলবদ্ধভাবেও কাজ করি না। আমার কোনও প্রশিক্ষণ নেই। আমি শুধু শরীরচর্চা করি।

হোজাবরির ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে মানুষ কমই জানতো। তিনি ইরানের কোন শহরের বাসিন্দা তাও জানতো না। তবে গ্রেফতার হওয়ার পর তার ভিডিওটি হাজারো মানুষ শেয়ার করেছে। ইন্সটগ্রামের বাইরেও তিনি আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন।

ইন্সটগ্রাম ব্যবহারকারীদের গ্রেফতারের ঘটনায় অনেকে ক্ষোভ জানিয়েছেন। হোসেন রোনাঘি নামের এক ব্লগার বলেন, ‘যৌন নিপীড়নকারীরা যখন মুক্তভাবে ঘুরছে তখন ইরানে নাচ করার কারণে, খুশি থাকার কারণে, সুন্দর হওয়ার কারণে, অশোভনতা ছড়ানোর দায় দিয়ে ১৭ বছর ও ১৮ বছর বয়সীদেরকে আটক করা হচ্ছে শুনলে বিশ্বের যেকোনও মানুষের কাছে তা হাস্যকর ঠেকবে।’

মাসিহ আলিনেজাদ নামের একজন লিখেছেন, ‘তার নাম মায়েদেহ মাহি। সম্প্রতি ইন্সটগ্রামে নাচের ভিডিও পোস্ট করার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আপনি যদি ইরানি নারী হন এবং যদি আপনি নাচেন, গান করেন কিংবা চুল দেখান তবে আপনি অপরাধী বলে বিবেচিত হবেন। আপনি যদি আপনার নিজস্বতাকে উপভোগ করতে চান, তবে প্রতিনিয়ত আইন ভাঙতে হবে।’

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে নিরাপত্তা হেফাজতে ব্লগার সাত্তার বেহেশতির মৃত্যুর পর তখনকার সাইবার পুলিশ প্রধানকে বরখাস্ত করেছিল ইরান। ২০১৪ সালে ফ্যারেল উইলিয়ামস-এর কয়েকজন ভক্ত তেহরানের একটি বাড়ির ছাদের উপর তার একটি গানের সঙ্গে নাচতে নাচতে ভিডিও ধারণ করায় গ্রেফতার হয়েছিল। তাদেরকে কারাদণ্ড ও দোররা মারার সাজা দেওয়া হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য