আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট প্রতিনিধি: ভারি বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীর পানি আবারো বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটের ৫ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বন্যার পানিতে নদীর তীরবর্তী এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ গত ৩ দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জেলায় বিশুদ্ধ পানি ও তীব্র খাবার সংকট দেখা দিয়েছে।

এখন পর্যন্ত তাদের মাঝে কোনো ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি। পানিবন্দি লোকজনের অভিযোগ, ত্রাণ বিতরণ তো দূরের কথা, জনপ্রতিনিধি বা সরকারি কর্মকর্তারা কেউ দেখতেও আসেনি। মঙ্গলবার সকাল থেকে তিস্তা নদী পানি আবারো বাড়তে শুরু করে। জেলার হাতীবান্ধায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের দোয়ানী পয়েন্টে মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় বিপদ সীমার ৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে থাকে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড দোয়ানী-ডালিয়া সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা পাড়ের লোকজনের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভারত গজল ডোবা ব্যারাজের অধিকাংশ গেট খুলে দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গতিতে পানি বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। পানির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে তিস্তা ব্যারাজের অধিকাংশ গেটই খুলে দেয়া হয়েছে।

তিস্তার পানিতে জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বহুল আলোচিত ছিটমহল আঙ্গোরপোতা-দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিঙ্গিমারী, সিন্দুনা, পাটিকাপাড়া ও ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়ন, পার্শ্ববর্তী কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার বেশ ইউনিয়নের চর এলাকার ২০ গ্রামের ১০ হাজার মানুষ গত ৩ দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

কয়েক হাজার একর আমন ধানের ক্ষেতসহ অনেক ফসলি জমি তিস্তার পানিতে ডুবে গেছে। হাতীবান্ধা উপজেলার ধুবনী গ্রামের অস্থায়ী বাঁধগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। এ বাঁধ ভেঙ্গে গেলে তিস্তার পানি হাতীবান্ধা শহরে ঢুকে পড়বে। ইতিমধ্যে চর এলাকাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে গেছে। জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার দক্ষিণ ধুবনী গ্রামে একটি অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এতে ওই এলাকার অনেক পরিবার নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়ছেন। চর এলাকাগুলো থেকে খবর আসছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট দেখা দিয়েছে চরম আকারে। এখনো পানিবন্দি পরিবারগুলোর মাঝে কোনো খাবার বিতরণ করতে দেখা যায়নি।

হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য জাকির হোসেন জানান, ওই এলাকায় বেশ কিছু পরিবার গত ৩ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। তাদের মাঝে খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান রোজ্জাকুল ইসলাম কায়েদ জানান, তার ইউনিয়নে ৮ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। চর এলাকাগুলো বিশুদ্ধ পানি ও খাবার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর মাঝে কোনো ত্রাণ বা খাবার বিতরণ করা হয়নি।

সিন্দুনা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নুরুল আমিন জানান, তার ইউনিয়নে প্রায় ২ হাজার পরিবার ৩ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায়। এখন পর্যন্ত তিনি কোনো সরকারি ত্রাণ বরাদ্দ পাননি। ত্রাণের জন্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। তবে হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে পানিবন্দি পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, তিস্তার পানি আরো বৃদ্ধি পেলে তিস্তা ব্যারাজ রক্ষার্থে পাউবো ‘ফ্লাড বাইপাস’ কেটে দিতে পারে। এ বাঁধ কেটে দিলে গোটা লালমনিরহাট জেলার লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়বে। এতে কোটি কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হবে। তিস্তা ব্যারাজ দোয়ানী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল আলম চৌধুরী জানান, ভারত গজল ডোবা ব্যারাজের অধিকাংশ গেট খুলে দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য