আমেরিকা বলতেই আমাদের চোখের সামনে যে উজ্জ্বল-চাকিচিক্যময় আভিজাত্যের বাস্তবতা হাজির হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সমাজের অবস্থা তেমন নয় মোটেও। এখনও দারিদ্র্যের কবল থেকে মুক্তি মেলেনি দেশটির কয়েক কোটি মানুষের। বছরে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে ওই দারিদ্র্যের কারণেই। শিশুসহ স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত লাখ লাখ মানুষ। মাথার ওপর ছাদ নেই লাখ লাখ মানুষের। এমন বাস্তবতায় অর্ধশতাব্দী আগে নোবেলজয়ী মানবতাবাদী অধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিং-এর ‘দরিদ্র জনতার আন্দোলন’ কর্মসূচির (পু্ওর পিপল ক্যাম্পেইন) পুনর্জাগরণ ঘটেছে সে দেশে। নতুন করে সংগঠিত সেই ক্যাম্পেইন দাবি তুলেছে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের। দুইজন সাধারণ মার্কিন অধিকারকর্মীর ঘোষিত ৪০ দিনের কর্মসূচিতে ঢল নেমেছে মানুষের। প্রধান ধারার সংবাদমাধ্যমে এ সংক্রান্ত সংবাদের জন্য তেমন কোনও জায়গা না মিললেও মূলধারার বাইরের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ সংক্রান্ত খবর হাজির করেছে পাঠকের সামনে। দেখা গেছে, নিজেদের অর্থ খরচ করে পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে এই ডাকে সাড়া দিয়েছে রাজধানী ওয়াশিংটনসহ ৫০টি অঙ্গরাজ্যের লাখো মানুষ।

গুপ্তঘাতকের হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগে ১৯৬০’র দশকে আমেরিকার দরিদ্র মানুষদের সুরক্ষার প্রশ্নকে সামনে এনেছিলেন মার্কিন মানবাধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিং। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনকে অনুপ্রেরণায় নিয়ে অর্থনৈতিক সমতার ডাক দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল গুপ্তঘাতকের হত্যার শিকার হওয়ার আগে তার নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে সম্প্রসারিত করেছিলেন লুথার কিং। দরিদ্র আমেরিকাবাসীর সুরক্ষা ও নাগরিক সেবা আদায়ের জন্য অর্থনৈতিক বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন তিনি। এই আন্দোলনের নাম দিয়েছিলেন ‘পুওর পিপলস ক্যাম্পেইন’। অর্ধ শতাব্দী পরে সেই আন্দোলনের পুর্নজাগরণ ঘটছে মার্কিন সমাজে। ধর্ম-নৈতিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পথে মার্কিন সমাজের পুনর্গঠনের ডাক দিয়েছেন দুই মার্কিনি। সামাজিক ন্যায়বিচারের ডাক দেওয়া দুই মার্কিনি হলেন উইলিয়াম জে বারবার এবং লিজ থিইয়ারিস। প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী বারবার নর্থ ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যের রাজনীতিক। বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালারড পিপল-এনএএসিপি এর ন্যাশনাল বোর্ডের সদস্য এবং এর পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটির সভাপতি। নর্থ ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যের গ্রিনলিফ খ্রিস্টান চার্চের যাজক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। লিজ থিওহারিস কায়রোস-এর সেন্টার ফর রেলিজিয়ন, রাইটস অ্যান্ড সোশ্যাল জাস্টিস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়কারী। ইউনিয়ন থিওলজিক্যাল সেমিনারির দারিদ্র্য বিমোচন সংক্রান্ত উদ্যোগেরও সমন্বয়ক তিনি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য বিমোচনে দরিদ্র মানুষদের সংগঠিত করার কাজ করছেন দুই দশক ধরে।

১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল গুপ্তঘাতকের হত্যার শিকার হওয়ার আগে দেশব্যাপী বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, নৃগোষ্ঠীর দরিদ্র মানুষদের নিয়ে রাজধানী ওয়াশিংটনে জমায়েত করতে চেয়েছিলেন লুথার কিং। প্রথম উদ্যোগ হিসেবে হাজার হাজার অংশগ্রহণকারীর জন্য আবাসিক এলাকা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অহিংস নাগরিক অসহযোগের একটি ধরণ হিসেবে নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছিল ওই অঞ্চলকে। তবে ওয়াশিংটনের ওই বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়নি মার্টিন কিং-এর। তার আগেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন তিনি। এক সপ্তাহের মধ্যে তার প্রতি সংহতি জানিয়ে ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়াল হলে সমবেত হয়েছিল প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। অর্ধ-শতাব্দী পর উইলিয়াম জে বারবার এবং লিজ থিউহারিস-এর হাত ধরে কিং-এর সেই পুওর পিপল ক্যাম্পেইনের পুর্নজাগরণ ঘটায় মার্কিন সমাজে নাগরিক অবাধ্যতার নতুন জোয়ার এসেছে।

৫০ বছর আগের সেই আন্দোলনের থেকে আজকের মার্কিন সমাজের ঐতিহাসিক পরিক্রমার ধারা-প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে নতুন করে সংগঠিত ‘পু্ওর পিপল ক্যাম্পেইন’র উদ্যোগে। তাদের ‘দ্য সোলস অব পু্ওর ফোক’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কিং-এর সেই আন্দোলনের ৫০ বছর পরে এসেও যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারিত দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ। আর নিম্ন আয় অথবা দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছেন ১৪ কোটি মার্কিনি, যারা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি (৪৩.৫ শতাংশ)। শিশুদের ১০ জনের মধ্যে চারজন সেখানে অন্তত এক বছর দারিদ্র্যের মধ্যে কাটাতে বাধ্য হয়। প্রতিবছর আড়াই লাখ মানুষ দারিদ্যের কারণে মারা যায়। এই দারিদ্র্যের বাস্তবতাকে সমাজের অন্যান্য বাস্তবতার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেন না তারা। এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলে যায়, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর হালনাগাদ করা ‘ইউএস সেনসাস ব্যুরোর’ পরিসংখ্যানও। এই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৮ জনে ১ জন অন্তত দরিদ্র। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৪ কোটি দরিদ্র মানুষ মোট জনসংখ্যার ১২.৭ শতাংশ। এদের মধ্যে ১ কোটি ৮৫ লাখ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেন, যাদের পারিবারিক আয় দারিদ্র্য সীমার অর্ধেকের কম। যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্য ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দেশটিতে দিনকে দিন ধন বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। দিনে ২ ডলারেরও কম অর্থে জীবন ধারণ করতে বাধ্য হওয়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

মার্কিন সমাজের অসমতা ও দারিদ্র্যের বাস্তবতাকে পু্ওর পিপল ক্যাম্পেইন-এর সংগঠকরা ৫টি পরস্পর-সম্পর্কযুক্ত বিষয়ের ফলাফল মনে করেন। এগুলো হলো: ১. কাঠামোগত বর্ণবাদ, ২. কাঠামোগত দারিদ্র, ৩. প্রাণ-প্রকৃতি ও প্রতিবেশের মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়, ৪. যুদ্ধ অর্থনীতি ও সামরিকতন্ত্র আর ৫. ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের নৈতিকতার ভুয়া বয়ান- যাতে বলা হয় এসব ইস্যুকে তোমরা সামনে এনো না। এই বাস্তবতার অবসান চেয়ে তারা ৪০ সপ্তাহের আন্দোলন-কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ১৪ মে প্রথম সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসিতে বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় এই কর্মসূচি। ৩৫টি অঙ্গরাজ্যের মানুষ দারিদ্রতাকে সহিংসতা আখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হওয়া প্রতিপাদ্যের বিক্ষোভে শামিল হয়। ওয়াশিংটনের বিক্ষোভস্থল থেকে আন্দোলনের দুই নেতা বারবার ও থিউহারিসসহ অন্তত ২০০ মানুষকে গ্রেফতার অথবা হাজিরা দেওয়ার জন্য সমন পাঠানো হয়। দ্বিতীয় সপ্তাহে ২১ মে শিকাগো ও স্প্রিংফিল্ডে শুরু হওয়া বিক্ষোভে পদ্ধতিগত বর্ণবাদ ও দারিদ্রের ওপরে জোর দেওয়া হয়। ভোটাধিকার, অভিবাস, ইসিলামফোবিয়া ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অসদাচারণকে করা হয় এই সপ্তাহের বিক্ষোভের প্রতিপাদ্য। ২৮ মে কর্মসূচির তৃতীয় সপ্তাহে নর্থ ক্যারোলিনায় অনুষ্ঠিত হয় জোরালো বিক্ষোভ। এই সপ্তাহের প্রতিপাদ্য করা হয় ‘যুদ্ধ অর্থনীতি: সামরিকতাবাদ এবং বন্দুক সহিংসতার বিস্তৃতি’। আগের বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে গ্রেফতার হওয়াদের জামিনের জন্য আইনি লড়াইয়ের প্রয়োজনে অর্থ সংগ্রহ করা হয় এদিনের কর্মসূচি থেকে। ফ্রাঙ্কফুর্ট, কেন্টাকির রাজপথে সামরিকতন্ত্রের বলি হওয়া মানুষদের স্মরণে চক দিয়ে আঁকা হয় প্রতিকৃতি। মিশিগানের স্টেট ক্যাপিটল ভবনের বলরুম দখল করে নেয় বিক্ষোভকারীরা। নিউ ইয়র্ক আর ক্যালিফোর্নিয়াতেও একই চেষ্টা হয়।

চতুর্থ সপ্তাহের কর্মসূচি শুরু হয় মিশিগান রাজ্যের রাজধানী লিনসিংয়ে। প্রতিপাদ্য ছিল ‘স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যকর পৃথিবীর অধিকার: পরিবেশ লুন্ঠন এবং স্বাস্থ্য সেবা’। ১১ জুন পঞ্চম সপ্তাহের বিক্ষোভের প্রতিপাদ্য করা হয় ‘প্রত্যেকের জীবনের অধিকার: শিক্ষা, বাঁচার মতো মজুরি, চাকুরি, আয়, আবাসন’। ১৮ জুন ষষ্ঠ ও চূড়ান্ত সপ্তাহের বিক্ষোভে থিম হলো ‘বিকৃত নৈতিকতাবোধের বিরুদ্ধে আনকোরা ও অদম্য একদল মানুষের লড়াই’। এই সপ্তাহের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দেয় মেক্সিকো সীমান্তে আলাদা হয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যরাও। ২৩ জুন ওয়াশিংটনে ক্যাপিটল মলে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ঘোষিত কর্মসূচী। ক্যাপিটল চত্বরের দুটি ব্লক ছাড়িয়ে যাওয়া সেই হাজার হাজার মানুষের সমাবেশে আন্দোলনের নেতা উইলিয়াম বারবার নৈতিক জাগরণের ডাক দেন। কর্মসূচি চলাকালে ধাপে ধাপে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা গেছে। এর কারণ সম্পর্কে ‘পিবিএস নিউজ আওয়ার নামের’ টেলিভিশন শোতে হাজির হয়ে আন্দোলনের সংগঠক উইলিয়াম বারবার বলেন, এই সংখ্যা বাড়ছে, কারণ আমরা তা করছি, আমরা আন্দোলনের সূচনা করছি। আমরা আন্দোলনের শেষ করছি না। তিনি বলেন, আমরা পশ্চিম ভার্জিনিয়া থেকে উইসকনসিন, আলবামা থেকে আলাস্কা পর্যন্ত যাচ্ছি। এসব জায়গায় এমন সব মানুষকে পাচ্ছি যারা বলছে এখন আমাদের উঠ দাড়ানোর সময়, নিরবতা প্রত্যাখান করার সময়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য