রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ সংক্রান্ত রয়টার্সের এক বিশেষ অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, গত বছরের আগস্ট থেকে ওই জনগোষ্ঠীর ৭ লাখ মানুষকে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দুইটি পতাদিক বাহিনী। রাখাইনে ওই দুই বাহিনীর নেতৃত্বেই সংঘটিত হয়েছে যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধ। রয়টার্স তাদের বিশ্লেষণে দেখিয়েছে, ওই দুই বাহিনী যা করেছে, তার সার্বিক নির্দেশনা এসেছে সেখানকার শীর্ষ জেনারেল মিন অং হ্ল্যাং-এর কাছে থেকে। তাকেই নিধনযজ্ঞের নেপথ্য কারিগর আখ্যা দিয়েছে রয়টার্স।

২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ছয় লাখেরও বেশি মানুষ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ আখ্যা দিয়েছে। রয়টার্স এই নিধনযজ্ঞের ঘটনায় অব্যাহতভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে। নিধনযজ্ঞের ঘটনা অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সত্য উদঘাটনে সমর্থ হয়েছে তারা।

রয়টার্সের সবশেষ অনুসন্ধানে প্রথমবারের মতো জানা গেছে, মিয়ানমারের ৩৩তম ও ৯৯তম পদাতিক বাহিনীই সেখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নিধনযজ্ঞে মূল ভূমিকা পালন করেছে। তারা সেখানকার শীর্ষ সেনাকর্মকর্তা মিং হ্ল্যাং-এর দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, রাখাইনে দুই পতাদিক বাহিনীর ভূমিকা মূলত তারই নির্দেশনার ফলাফল। হত্যাযজ্ঞের আগে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা একটি বৈঠকে বসেন। তারা রোহিঙ্গা গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে ‘খারাপ লোকদের’ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। এরপর শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। রয়টার্স দেশটির সামরিক বাহিনীর পদক্ষেপগুলো পর্যালোচনা করে দেখিয়েছে, তারাই ৭ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করেছে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলীয় গ্রাম ইনদিনে সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা ১০ রোহিঙ্গাকে গুলি করে হত্যা করে। তাদের রাখা হয় গণকবরে। ঘটনার সরেজমিন অনুসন্ধানে নেমেছিলেন রয়টার্সের দুই সাংবাদিক ওয়া লোন এবং কিয়াও সোয়ে ও। ডিসেম্বরে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এরপর অভিযোগ আনা হয় দাফতরিক গোপনীয়তা ভঙ্গের আইনে।

এ বছর ফেব্রুয়ারিতে কর্তৃপক্ষ রয়টার্সকে জানায়,ঘটনার অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তবে কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে রয়টার্সের সাংবাদিকদের দাফতরিক গোপনীয়তা ভঙ্গের সঙ্গে ওই তদন্ত সম্পর্কহীন বলে দাবি করা হয়। সেই তদন্তের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত ৭ সেনাকে এ মাসেই ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সেনা সদস্যদের সাজা ঘোষিত হলেও রয়টার্সের সেই দুই সাংবাদিক দাফতরিক গোপনীয়তার আইন লঙ্ঘনের দায়ে এখনও আটক রয়েছেন। তা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ নিয়ে অনুসন্ধান থামায়নি রয়টার্স।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য