বহুদিন ধরে অনেকেই বহু প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে দুর্ভোগ লাঘবে ১৮ গ্রামের মানুষ দেখতে পাননি একটি সেতু। একদিকে খরস্রোতা তিস্তা ও অপর দিকে সতী নদীর মাঝখানে ছিট মহলের মত অবরুদ্ধ হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়নের অর্ধলক্ষাধিক মানুষজন।

এসব গ্রামের বাসিন্দারা জানান, খরস্রোতা তিস্তার ভাঙনে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ১৫ থেকে ১৮টি গ্রাম।

এরমধ্যে রয়েছে খলাইঘাট, চর খলাইঘাট, সৈয়দ পাড়া, বগুড়াটারী, মলবিটারী, চিনাতুলি, কিসামত চিনাচুলি, ঠিকানা বাজার, পাগলার হাট, বালিমারী এবং কাউনিয়া উপজেলার প্রাণনাথ, হারাগাছ, মিলন বাজার ও একতা বাজারসহ আশেপাশের বেশ কিছু এলাকা। লালমনিরহাটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এসব গ্রামের মানুষদের অতিক্রম করতে হয় পানি ও বালুময় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার পথ।

অপরদিকে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা সদরের দূরত্ব মাত্র দেড় থেকে দুই কিলোমিটার। আর কাউনিয়া যেতে জেলার সীমান্তে রয়েছে সতী নদী। স্থানীয়রা বাঁশের সাঁকো বানিয়ে কাউনিয়া সদরের সঙ্গে যোগাযোগ সচল রেখেছেন। সতী নদীটি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার শহীদবাগ ইউনিয়নের প্রাণনাথ গ্রামে গিয়ে পড়েছে। লালমনিরহাটের জনগণের জন্য সেখানে একটি সেতুর প্রয়োজন।

দুই জেলার সীমান্তের রশি টানাটানিতে দীর্ঘ ৪৭ বছরেও সেতু নির্মিত হয়নি জনবহুল এই পথে। লালমনিরহাটের আদিতমারী ও সদর উপজেলার তিস্তা চরাঞ্চলের মানুষজন রংপুর যেতে এ পথ ব্যবহার করেন। দৈনিক গড়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার লোকের যাতায়ত। চরাঞ্চলের মানুষের উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে এটিই একমাত্র পথ। যোগাযোগ সমস্যার কারণে চরবাসী তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাঁশের সাঁকো হয়ে চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে গাড়ি ঢুকতে পারে না। ফলে তাদের উৎপাদিত পণ্য মহাজনকে সাঁকো পাড় করে দিতে হয়, যেটা তাদের জন্য ব্যয়বহুল। রংপুর শহরের বাজারগুলোতে যে সবজি ও কৃষিপণ্য আসে তার সিংহভাগই এসব চরাঞ্চলের চাষিদের উৎপাদিত পণ্য।

রাজপুর ইউনিয়নের খলাইঘাট গ্রামের কৃষক নুর ইসলাম বলেন, ভোট এলে দুই জেলার প্রার্থীরা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোটের পরে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ইউপি চেয়ারম্যানসহ মেম্বররাও শহরের বাড়িতে থাকেন। চরের মানুষ কৃষিতে মূল ভূখণ্ডের চেয়ে দ্বিগুণ এগিয়ে গেছে। শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নত হলেই উন্নয়নের সুদিন তারাও দেখতে পাবেন। দুই জেলার সীমান্ত হলেও বিভাগ বা দেশ তো একটাই। তবে কেন সেতুটি নির্মাণ হবে না? এমনটাই প্রশ্ন ওই কৃষকের।

খলাইঘাট গ্রামের কলেজছাত্র রবিউল ইসলাম বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো পাড়ি দিয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে হচ্ছে পাশ্ববর্তী কাউনিয়া সদরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তাদের গ্রামের প্রাথমিক পর্যায়ের ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা সাঁকো দিয়ে স্কুলে যেতে অনিহা প্রকাশ করে। অনেক সময় পরিবারের লোকজন নিজেরা সাঁকো পাড় করে স্কুলে দিয়ে যান এবং ছুটির সময় তাদের সন্তানদের নিয়ে আসেন, যা অত্যন্ত কষ্টকর। সেতুটি দ্রুত নির্মাণের দাবি জানান তিনিও।

এ পথে সেতু নির্মিত হলে তিস্তার কড়াল গ্রাসে ছিন্নমূল মানুষগুলোর অবরুদ্ধ জীবনের মুক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তিও মিলবে। পাল্টে যাবে তাদের জীবনযাত্রা। তাই চরবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবি প্রাণনাথ গ্রামের সতী নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা। সেতুটি নির্মিত হলে বদলে দিতে পারে এ অবহেলিত জনপদের ভাগ্যের চাকা।

রাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোফাজ্বল হোসেন মোফা বলেন, সতী নদীটি তার এলাকায় নয়। তাই সেতুর দাবি তোলা তার পক্ষে অসম্ভব। তবে ওই পথে তার ইউনিয়নের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষের যাতায়াত রয়েছে। তাই সেতুটি নির্মাণের খুবই প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য