কুড়িগ্রামের উলিপুরে সালিশ বৈঠকে পুলিশের সাথে জনতার সংঘর্ষের ঘটনায় পুরুষ শূন্য হয়ে পরেছে দুই গ্রামের মানুষ।

গ্রেফতার আতংকে ঈদের জামাতে অংশ নেয়নি এলাকার ৫ শতাধিক পুরুষ। একটি গ্রামের মসজিদে নামাজ আদায় করেছে মাত্র ৭জন বয়োবৃদ্ধ।

এছাড়াও আসামীদের না পেয়ে মহিলাসহ মানসিক রোগীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। গভীররাতে আসামী ধড়পাকড় করার নামে মহিলাদের হুমকী-ধামকী ও লাঞ্চনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিষয়টি নিয়ে উলিপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান কাউকে হয়রাণি করা হচ্ছে না জানিয়ে বলেন, এধরণের কোন ঘটনা ঘটলে আমাকেসহ উর্দ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করতে পারেন।

সালিশ বৈঠকে জমিদার রায় নামে এক পৌর কাউন্সিলকে লাঞ্ছিত করার জের ধরে পুলিশের লাঠিচার্জের ফলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে জনতা। এতে স্থানীয় জনতা, পুলিশ ও কাউন্সিলরসহ আহত হন ১০ জন।

ঘটনাটি ঘটেছে উলিপুর উপজেলার পৌর এলাকার পশ্চিম শিববাড়ি ও ঠগপাড়া গ্রামে। গ্রেফতার এড়াতে বর্তমানে পুরুষ শূন্য হয় পরেছে ওই দুই গ্রামের মানুষ।

প্রত্যক্ষদর্শী ও গ্রামবাসী সুত্র জানায়, পৌরসভার পশ্চিম শিববাড়ি গ্রামের মোক্তার আলীর কন্যা ইনুকা বেগমের (২৫) সাথে পশ্চিম নাওডাঙ্গা গ্রামের নাছির উদ্দিনের পুত্র আসাদুল ইসলামের (৩৫) সাথে ৩ বছর পূর্বে বিয়ে হয়।

বিয়ের পর মেয়ের নামে দুই শতক জমি লিখে দিয়ে সেখানেই ঘরজামাই হিসেবে সংসার করছিল তারা। কিন্তু দুজনের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় ইনুকাকে তালাক দেয় আসাদুল। পরে দুই শতক জমি দাবি করে নিজের নামে লিখে দেয়ার জন্য সাবেক স্ত্রী ও স্বজনদের চাপ দেয় আসাদুল। ৮ জুন ইনুকাদের বাড়িতে এসে পূণরায় চাপ সৃষ্টি করলে তাকে আটকে রাখে স্বজনরা।

এ ঘটনায় আসাদুলের ভাই সফিকুল ৯ জুন উলিপুর থানায় ইনুকা ও স্বজনদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করে। পুলিশ ওই ওয়ার্ডের (২নং) কাউন্সিলর জমিদার রায়কে নিয়ে ওইদিন রাতে আসাদুলকে উদ্ধার করতে যায়।

স্থানীয়রা বিষয়টি নিয়ে মীমাংসা-বৈঠকের চেষ্টা করে। এনিয়ে কাউন্সিলর জমিদার রায়ের সাথে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে তাকে লাঞ্ছিত করে বৈঠকে আসা লোকজন।

পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে লাঠিচার্জ করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় স্থানীয় জনতা। এ সময়, উমর আলী (৭০), জোসনা বেগম (৬২), আদরী বেগম (৩৩), আসাদুল (৩৫), কাউন্সিলর জমিদার রায় (৩২) ও পুলিশসহ আহত হয় প্রায় ১০জন।

এ বিষয়ে কাউন্সিলর জমিদার রায় জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশসহ আসাদুলকে উদ্ধার করতে গেলে আমার উপর জনতা অন্যায়ভাবে হামলা করে। ফলে সরকারিকাজে বাঁধা সৃষ্টির অভিযোগে নামীয় ১৪ জন ও অজ্ঞাতনামা ৪০/৪৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

হস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই দু’গ্রামের মানুষের সাথে সরজমিন কথা বলা হয়। এসময় বের হয়ে আসে নানা ভোগান্তির ঘটনা। ওই এলাকার মজিরন বেগম (৬০), মোর্শেদা বেগম (৬২), ফাতেমা বেগম (৬৫), মোর্শেদা বেওয়া (৫৫), বুলবুলি বেগম (২৫), লাইলী বেগম (৫০)সহ বেশ কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, পুলিশ তালিকাভূক্ত আসামী ধরতে না পেয়ে ছফুরা বেগম (৫০), নুর আলম (৪৫) ও মানিক মিয়াকে (২২) আটক করে। ভয়ে কয়েকজন বৃদ্ধ ছাড়া পুরুষ শূন্য হয়ে পরেছে দু’গ্রামের মানুষ।

এছাড়াও তারা আরও জানান, ‘হামারগুলার ঈদ এবার মাটি হয়া গেইছে। সেমাই পর্যন্ত আন্দন-বাড়ণ হয় নাই। দিন রাত পুলিশের ভয়োত থাকি। বুক খালি ধড়ফড় করে।

পশ্চিম শিববাড়ি জামে মসজিদের মোয়াজ্জিন নুরুল ইসলাম (৭২) জানান, মাত্র ৭জন বয়োবৃদ্ধ মানুষ নিয়া ঈদের নামাজ আদায় করছি। ভয়ে এলাকার মানুষ ঈদের জামাতে আসে নাই।

বৃষ্টির কারণে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তে আসা হাজী মেসের আলী (৬৮), মহুবর রহমান (৭৫) ও আইজার রহমান (৭০) জানান, প্রতিবার এই মসজিদ ও বারান্দা মিলে তিনশ’র মতো মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করে। এবার মাত্র ৭জনকে নিয়ে নামাজ পড়া হয়েছে।

ওই গ্রামের সমস্তভান (৫২), শরিফা বেগম (৪২), হাছনা বেগম (৩৫), সহিদা বেগম (৩৩) জানান, গ্রামে দিনে রাইতে পুলিশ আইসে। স্বামী সন্তানদের না পায়া হামাকগুলাক হুমকি ধামকি দেয়। এসময় লাঞ্ছিত করার অভিযোগে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

গ্রেপ্তারকৃত মানিক মিয়ার পিতা মেছের আলী (৬৫) অভিযোগ করেন, আমার ছেলে মানসিক রোগি। তাকে ৩ বছর থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান জ্যোতির্ময় রায়ের কাছে চিকিৎসা করাচ্ছি। এজাহারে তার নাম না থাকার পরও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। বৃহস্পতিবার মানিক মিয়া ও ছফুরা বেগম (৫০) কে বিজ্ঞ আদালত থেকে জামিন নেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে উলিপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান জানান, এ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কাউকে হয়রাণি করা হচ্ছে না। হয়রাণির অভিযোগ পেলে আমাকে অথবা আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে পারেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য