মেক্সিকো সীমান্তের অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিলেও এক নির্বাহী আদেশে এই বিচ্ছিন্নকরণ বন্ধের সিদ্ধান্ত দিতে বাধ্য হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইতোমধ্যেই বিচ্ছিন্ন হওয়া ২ হাজারের বেশি শিশুর ব্যাপারে কোনও কিছু বলা হয়নি ট্রাম্প কিংবা তার প্রশাসনের পক্ষ থেকে। মা-বাবা কিংবা অভিভাবকদের ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র/আটককেন্দ্রে দিন কাটাতে হচ্ছে ওই শিশুদের। শিশুকেন্দ্র পরিদর্শনকারী চিকিৎসক ও আইনজীবীরা বলছেন, মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এসব শিশু আতঙ্কে ভুগছে। তাদের কান্নার আওয়াজে আশ্রয়কেন্দ্রের খেলাঘরও ভারী হয়ে উঠছে। বাদ যায়নি ৩ বছরের শিশুও। সদ্য আটকাদেশ থেকে মুক্ত এক মা খুঁজে পাচ্ছেন না তার সন্তানকে। সাত বছরের শিশুর হদিস না পেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ওই মা। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতো অল্প বয়সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে এসব শিশুর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

অতীতে মেক্সিকো সীমান্ত পেরিয়ে আমেরিকায় প্রবেশকারীদের অপরাধের রেকর্ড না থাকলে তাদের কেবল অস্থায়ীভাবে আটক রাখা হতো। এ কারণে শিশুরা তাদের অভিভাবকদের সঙ্গেই থাকতে পারত। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া জিরো টলারেন্স নীতিতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা সব মানুষকেই আইনের আওতায় নেওয়া হচ্ছে। শিশুরা আইনের চোখে অপরাধী না হওয়ায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অবৈধ অভিবাসীদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নকরণের ঘটনা পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনগুলোতেও দেখা গেছে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সে সংখ্যাটা অনেক কম ছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স নীতি’র আওতায় অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশীদের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আটক ও মামলার বলি হয়েছে দুই হাজারেরও বেশি শিশু। মার্কিন অভিবাসন কর্মকর্তারা বলেছেন, ৫ মে থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ২ হাজার ২০৬ জন বাবা-মার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে ২ হাজার ৩৪২ জন শিশুকে।

সাবেক ও বর্তমান ফার্স্ট লেডি, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট নেতাসহ নির্বিশেষে ট্রাম্প প্রশাসনের শিশু বিচ্ছিন্নকরণ পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। ফুঁসে ওঠে সাধারণ মার্কিনিরাও। দেশের বাইরেও ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ও কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোসহ অনেকেই সমালোচনা করেন। চাপের মুখে বিচ্ছিন্নকরণ ঠেকাতে ‘পরিবারকে একত্রিত রাখা’র এক নির্বাহী আদেশ জারি করেন ট্রাম্প। তবে সেই আদেশেও ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্ন হওয়া এই দুই সহস্রাধিক শিশুর ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি।

কয়েক দশক আগেই যুক্তরাষ্ট্রের শিশু কল্যাণ ব্যবস্থার পক্ষ থেকে অনাথ আশ্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। শিশুরা দীর্ঘস্থায়ী ট্রমায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে অনাথ আশ্রমগুলো বন্ধ করা হয়। কয়েক দশক পর এসে মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন মধ্য আমেরিকান শিশুদের আটকে রাখার জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ছে মার্কিন প্রশাসন। জোর করে মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা এসব শিশুর জায়গা হয়েছে সাউথ টেক্সাসের কয়েকটি আশ্রয় কেন্দ্রে। হাউস্টনেও এমন আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করেছে সরকার। সাউথ টেক্সাসের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মার্শা গ্রিফিন বেশ কয়েকবার এসব আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপিকে তিনি বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সমস্যা নয়, শিশুদেরকে তাদের মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন করাটাই সমস্যা।’

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অভিবাসী প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র উরসুলার চিত্রটাও ভয়াবহ। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির এক কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে শিশুদের বিচ্ছিন্নকরণ প্রক্রিয়ায় উরসুলাকে ‘কেন্দ্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এসব প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রেই অভিবাসন প্রত্যাশী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি থেকে তার সন্তানকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৭ মে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ ঘোষণার পর সাউথ টেক্সাস রিও গ্রান্ডে ভ্যালি সেক্টরে ১,১৭৪ জন শিশুকে তাদের মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। বর্ডার পেট্রোলের সেক্টর প্রধান ম্যানুয়েল পাডিলা জানান, এরমধ্যে অনেককেই টেক্সাসের ম্যাকালেন প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।

কঠোর নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা উরসুলার দরজা ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন এনবিসির সাংবাদিকেরা। পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করার আগে অভিবাসন প্রত্যাশীদের অবস্থাটা কী হয় তা সরেজমিনে দেখতে গিয়েছিলেন তারা। এনবিসির প্রতিবেদন বলছে, এ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রটিতে ধাতব তারের বেষ্টনী তৈরি করে শত শত শিশুকে আটকে রাখা হয়েছে। দেখে মনে হয়, খাঁচাবন্দি করে রাখা হয়েছে শিশুদেরকে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী, যেকোনও বয়সের মানুষকেই এ ধরনের প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলোতে ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আটক রাখা যায় না। তবে হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসে শিশুদের জন্য তৈরি কেন্দ্রগুলোতে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের পরও শিশুদেরকে প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে থাকতে হচ্ছে।

আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে ফস্টার কেয়ারে থাকা শিশুদের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আট মাস ধরে মিশিগানে একটি ফস্টার কেয়ার হোমে (শিশু লালন-পালন কেন্দ্র) আশ্রয় নেয় ১০ বছর বয়সী এক গুয়াতেমালান শিশু। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এ শিশুটি যখন প্রথম ফস্টার কেয়ার হোমে আসে তখন তার বয়স ছিল ৯ বছর। গত বছরের অক্টোবরে মিশিগানের গ্র্যান্ড র্যা পিডস-এর বিমানবন্দর থেকে শিশুটিকে নিয়ে আসেন ওই ফস্টার কেয়ার হোমে শিশু পালনকারী মা-বাবা কার্ল ও জেন। তারা জানান, শুরুতে গুয়াতেমালান শিশুটি খুব ভীত ছিল। সে এতোটাই ভীত ছিল যে খেতেও পারছিল না। আস্তে আস্তে জেন ও কার্লের কাছে সবকিছু খুলে বলে শিশুটি। জানায়, গুয়াতেমালায় সহিংস ও দারিদ্র্যপূর্ণ জীবন থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছিল সে ও তার বাবা। তবে মেক্সিকো সীমান্তে পৌঁছানোর পর তাদেরকে আরও অনেক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। চোখের সামনেই বাবাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ।

জেন জানান, শিশুটিকে তাদের ফস্টার কেয়ার হোমে আনার পর প্রথম প্রথম ‘সে খেতে ভয় পেতো, তাকাতে ভয় পেতো, তার কাপড় কাদায় ভরে ছিল, ও বাথরুম ব্যবহার করতো না।’ শিশুটি একদিন জেন ও কার্লকে সেলাই করা একটি প্যাকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে দিলো। ছেলেটি ও তার বাবা বাড়ি ছাড়ার আগে তার মা কাগজটি দিয়েছিল। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজনের ফোন নাম্বার এবং মায়ের ফোন নাম্বার লেখা ছিল। পরে তার মাযের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। জেন ও কার্ল জানান, ওই শিশুর বাবাকে এরইমধ্যে গুয়াতেমালায় বিতাড়িত করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছেন তারা। শিশুটিও গুয়াতেমালায় ফিরে গেছে।

অবৈধ অবিবাসন প্রত্যাশীদের ধরতে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিাকো সীমান্তে মার্কিন বর্ডার প্রেট্রোল এজেন্টদের গাড়ি

গুয়াতেমালার শিশুটি পরিবারের কাছে ফিরে গেলেও সে ভাগ্য সবার হয়নি। আটককেন্দ্র থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সাত বছরের সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন এক মা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি’র আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার (১৯ জুন) ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তিনি। মামলায় বিয়াতা মারিয়ানা দে জেসুস মেজিয়া নামের ওই নারী অভিযোগ করেন, গত ১৯ মে আরিজোনার কাছে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন তিনি তার পুত্র। অভিবাসী হিসেবে আশ্রয় প্রার্থনা করেন তারা। বর্ডার পেট্রোলের সদস্যরা তাকে আটক করে এবং দুইদিন পর সন্তানকে তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্লি ট্রমা ট্রিটমেন্ট নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন আলিসিয়া লিবারম্যান। তার মতে, দশকের পর দশক ধরে হওয়া বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে কম বয়সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মানুষের মানসিক অবস্থা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আলিসিয়া বলেন, ‘শিশুরা জৈবিকভাবেই মা-বাবার সাহচর্যে সবচেয়ে ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ও অপ্রত্যাশিত বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে যদি সে বন্ধন ভেঙে যায় এবং পুনর্মিলনের কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকে, তখন শিশুদের মধ্যে প্রচণ্ডরকমের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।’

আলিসিয়া লিবারম্যান আরও বলেন, শিশুরা যখন আতঙ্কে থাকে তখন বেড়ে যাওয়া স্ট্রেস হরমোন প্রবাহ মস্তিষ্কের নিউরাল সার্কিট প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, তৈরি করে উচ্চ পর্যায়ের উদ্বেগ। তাদেরকে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায় ফেলে এবং তাদের আবেগ সামলানো, মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখা ও বয়স উপযোগী কর্মকাণ্ডের সক্ষমতা নষ্ট হয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য