রাখাইন থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের প্রতি চাপ প্রয়োগে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে জি-৭ জোটভুক্ত দেশসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শনিবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় কানাডার কুইবেকে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ লিডারস অধিবেশনে তিনি এ আহ্বান জানান। এ সময় তিনি বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমিতে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিতে এবং নিপীড়নকারীদের বিচারের মুখোমুখি করতে জি-৭ আরো বেশি সহযোগিতা চেয়ে চারটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন।

প্রধানমন্ত্রী যে চারটি প্রস্তাব দিয়েছেন সেগুলো হল:

১. জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিজস্ব মাতৃভূমিতে সুষ্ঠু ও নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়নে মিয়ানমারকে তাগাদা দেয়া।

২. রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশনের সুপারিশগুলো এখনই শর্তহীনভাবে বাস্তবায়নে মিয়ানমারকে তাগিদ দেয়া।

৩. জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিপীড়নের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।

৪. রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহারে চালানো অমানবিক নিপীড়নে জড়িতদের জবাবদিহিতা ও বিচার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।

অধিবেশনে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে বলেন, “আমি আগেও বলেছি আবারো বলছি, রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে। মিয়ানমারকেই এর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে যাতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকরা যাতে তাদের নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারে; যেখানে তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী বসবাস করে আসছে।”

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা ইতোমধ্যে মিয়ামারের সঙ্গে চুক্তি করেছি। রোহিঙ্গাদের স্থানীয় ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আমরা এর সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর’কে সম্পৃক্ত রেখেছি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়নে মিয়ানমারের উচিত তাদের রাখাইন রাজ্যে সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করা এবং বারবার বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে ধেয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থী ঢল থামাতে মিয়ানমার সরকারের উচিত কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা। এ ব্যাপারে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের আরো বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন, বিশেষ করে জি-৭ জোটভুক্ত দেশের কাছ থেকে।”

প্রায় ১১ লাখ মিয়ানমারের নাগরিকের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নিজেদের দেশে জাতিগত নির্মূলের মুখোমুখি হয়ে রোহিঙ্গারা তাদের জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আমাদের জনগণ তাদের বাড়িঘর, তাদের হৃদয় বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের জন্য খুলে দিয়েছে, তাদের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করে নিয়েছে। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও নিজস্ব সম্পদ দিয়ে আমরা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসাসহ অন্যান্য মৌলিক সেবা দিয়ে যাচ্ছি।”

তিনি বলেন, “বর্ষা ও সাইক্লোনের এ মৌসুমে বাড়তি সর্তকতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেয়া এক লাখ শরণার্থীকে ভাষানচরে নিরাপদ আশ্রয়ে নেব। সেখানে বসবাসযোগ্য, নিরাপদ এবং প্রাকৃতিক দুযোর্গ মোকাবেলার পযার্প্ত ব্যবস্থা থাকবে। সেখানে বসবাস এবং জীবনধারণের অধিকতর ভালো সুযোগ থাকবে।”

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের পাশে উদারভাবে দাঁড়িয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা সরবরাহ করেছে। ১২২টি স্থানীয়, আর্ন্তজাতিক এনজিও এবং জাতিসংঘের সংস্থা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করছে। সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”

শনিবার স্থানীয় সময় বেলা ১২টার দিকে কানাডার কুইবেকে লা মানোয়া রিশেলো হোটেলে আউটরিচ অধিবেশন শুরু হয়। সম্মেলন স্থলে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানান কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো।

আউটরিচ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও জি-২০ জোটের বর্তমান সভাপতি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট, ক্যারিবীয় কমিউনিটির চেয়ার, হাইতির প্রেসিডেন্ট, জ্যামাইকার প্রধানমন্ত্রী, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট, মার্শাল আইল্যান্ডসের প্রেসিডেন্ট, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী, আফ্রিকান ইউনিয়নের বর্তমান সভাপতি রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট, সেনেগালের প্রেসিডেন্ট, সেসেলসের প্রেসিডেন্ট, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট, ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপক, অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভলপমেন্টের (ওইসিডি) সেক্রেটারি জেনারেল, জাতিসংঘ মহাসচিব এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য