কুড়িগ্রামবাসীকে ঈদ উপহার হিসেবে ‘শেখ হাসিনা ধরলা সেত’ু উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় গণভবণ থেকে ফুলবাড়ী উপজেলার আছিয়ার বাজার এলাকায় ব্রীজের পূর্ব অংশে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি সেতুটি উদ্বোধন করেন। এসময় ভিডিও কনফারেন্সিং অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ-এমপি, জেলা প্রশাসক মোছা: সুলতানা পারভীন, সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো: জাফর আলী, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য এড’ সফুরা বেগম, শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ রাশেদুজ্জামান বাবু, বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার অধিবাসী হৈমন্তী শুক্লা প্রমুখ।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ, অতিরিক্ত সচিব রইচ উদ্দিন ও অতিরিক্ত সচিব মাহবুবুল আলম, তত্বাবধায়ক হারুন অর রশীদ, পুলিশ সুপার মেহেদুল করিম, জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আমিনুল ইসলাম মঞ্জু মন্ডল, লালমনিরহাট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এড.মতিয়ার রহমান, কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি এ্যড.আহসান হাবীব নীলু প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সরকারি, বেসরকারি, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিভিন্ন পেশাজীবীর প্রতিনিধিসহ স্থানীয় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি সরাসরি উদ্বোধন করা হলেও ফুলবাড়ীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়ে ছিল সাজ সাজ রব। নির্মাণ করা হয় শত শত তোড়ণ ও বিলবোর্ড। সেতুটির দুপাশের রেলিং রং-বেরংয়ের কাপড় ও লাল-সবুজের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়। ভিডিও কনফারেন্সে হাজার হাজার মানুষ বড় পর্দায় প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার জন্য বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে ভীড় জমায়। গণভবণ থেকে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে শেখ হাসিনা ধরলা সেতু আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন ঘোষনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় সেতুস্থলে উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করেন কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো: জাফর আলী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ বক্তব্যে আরও বলেন, রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার মানুষের জন্য এটি একটি ঈদ উপহার। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারীসহ এ অঞ্চলের প্রতিটি জেলায় এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে আমরা পদচারণা রয়েছে। এখানকার মানুষের দু:খ কষ্ট, অভাব, সমস্যা সবই আমার জানা। এ কারণেই প্রথম ধরলা সেতু করবার পর দ্বীতিয় ধরলা সেতু করা হয়েছে মানুষের আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য। কুড়িগ্রাম এক সময় ছিল মঙ্গাপীড়িত অঞ্চল।

১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসে মঙ্গা দূর করে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে পূণরায় মঙ্গা দেখা দেয়। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ পূণরায় ক্ষমতায় এসে কুড়িগ্রামে ব্যাপক উন্নয়নের মাধ্যমে চীরতরে মঙ্গা দূর করা হয়। এসময় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সিংএর মাধ্যমে সাবেক ছিটমহলবাসীসহ জেলাবাসীর সাথে মতবিনিময় করেন।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফুলবাড়ী উপজেলায় ধরলা নদীর উপর ৯৫০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী ও লালমনিরহাট সদর উপজেলার মধ্যবর্তী কুলাঘাট নামক স্থানে সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করেন। পরে সেটি একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়। শেখ হাসিনা সেতু নির্মাণে ২০১৪ সলে এলজিইডি সিমপ্লেক্স ও নাভানা কনস্ট্রাকশন গ্রুপের সাথে চুক্তি সম্পাদন করে ।

এটি নির্মাণে এলজিইডি ১৩ একর জমি অধিগ্রহন করে। নির্মাণে ব্যয় হয় ২০৬ কোটি ৮৫ লাখ ১৯ হাজার টাকা। ৯৫০ মিটার দীর্ঘ এবং ডাবল লেন সেতুর প্রস্থ ৯ দশমিক ৮০ মিটার,ক্যারেজ ওয়ে ৭ দশমিক ৩০ মিটার ও সেতুর উভয় পাশের্^ ১ মিটার চওড়া ফুটপাত রয়েছে। পিসি গার্ডার নির্মিত সেতুটিতে মোট স্প্যান রয়েছে ১৯টি। প্রতিটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার। ১৮টি পিয়ার ও ২৪০টি পাইল রয়েছে সেতুটিতে। নৌ-চলাচলের জন্য নূন্যতম নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স রাখা হয়েছে ৭ দশমিক ৬২ মিটার। রাতে নিরাপদে চলাচলের জন্য সেতুটিতে বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপন করা হয়েছে। ২ হাজার ৯১৯ সংযোগ সড়কের মধ্যে কুড়িগ্রাম প্রান্তে ৮৯২ মিটার এবং লালমনিরহাট জেলা প্রান্তে ২ হাজার ২৭ মিটার।

এছাড়াও উভয় জেলায় নদী শাসনের জন্য ফুলবাড়ী অংশে ১ হাজার ২৫৬ মিটার এবং লালমনিরহাট অংশে ২ হাজার ২৩৮ মিটার নদী শাসনের আওতায় আনা হয়েছে। সেতুটি নির্মানের জন্য ১৩ হাজার ৮৫৬ একর জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে। এতে ফুলবাড়ী অংশে ১০ হাজার ৫৬৮ একর এবং লালমনিরহাট অংশে ৩ হাজার ৮৮ একর। এই সেতু নির্মাণের ফলে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

এই সেতুিট উদ্বোধনের ফলে ধরলা নদী থেকে বিচ্ছিন্ন ফুলবাড়ী, নাগেশ^রী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলার প্রায় ১০ লাখ মানুষ উপকৃত হবে। ঢাকা যেত কমে যাবে ১শ’ কিলোমিটার পথ। এছাড়াও শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ছাড়াও কম সময়ে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাবে এই জনপদের মানুষ।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য