এটি দাঙ্গাল, পিকে কিংবা লাগন ছবিরও অনেক আগের কথা। ১৯৮৮ সালে মুক্তি পায় আমির খান কর্তৃক অভিনীত ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তাক’। আমির খান এবং জুহি চাওলার পর্দার রসায়ন তৎকালীন যুবসমাজের মনে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। তারা সেই প্রজন্মের আইডল বনে গিয়েছিলেন। রোমিও জুলিয়েটের সেই অপার ভালোবাসার কাহিনী হিন্দিতে রূপান্তর করে বলিউডে সিনেমায় রূপ দেয়া হয়েছিল। ছবিটি মুক্তির এক সপ্তাহের পর ছবির নির্মাতারা আমির খানের একটি পোস্টার প্রচারণা করেন যাতে লেখা ছিল, ‘আমির খান কে? আপনার পাশের বাসার মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করুন।’

কেয়ামাত সে কেয়ামাত তাক ছবিতে অভিনয় করা এই জুটি পরবর্তী সময়ে বি. শুভাশীষের ‘লাভ লাভ লাভ’ ছবিতে জুটিবদ্ধ হন। কিন্তু সেই সিনেমাটি দর্শকের তেমন মন জয় করতে পারেনি। সেই ছবির গান ‘নাচেঙ্গে হাম, গায়েঙ্গে হাম, ডিস্কো ডানডিয়া’ ছাড়া আর তেমন কিছুই তৎকালীন দর্শকের মন জয় করতে পারেনি।

শাহরুখ এবং কাজলের মতো সেই সময় আমির এবং জুহি একটি জুটি ছিল। কিন্তু কেয়ামাত সে কেয়ামাত তাক মুভি ছাড়া তারা তেমন কোনো সফলতার মুখ দেখতে পারেননি। লাভ লাভ লাভের পরবর্তী সময়ে আমির খান ‘তুম মেরে হো’, ‘দাওলাত কি জাং’ এই সিনেমা দুটিতে অভিনয় করেন। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই ব্যবসা সফল সিনেমা ছিল না।

কিন্তু কেয়ামাত সে কেয়ামাত তাক ছবির ৫ বছর পর আমির খান এবং জুহি জুটির জীবনে আসে আরেকটি সফল সিনেমা ‘হাম হ্যায় রাহি পেয়ার কে’। এই পাঁচ বছরে আমির আরো অনেক সিনেমায় কাজ করেছেন। যার মধ্যে একটি হলো ‘তুম মেরে হো’ এই সিনেমাটিতে মূলত আমির খান যৌতুক বিরোধী ভূমিকায় অভিনয় করেন।

জুহি ছাড়াও তিনি সেই সময় অন্য নায়িকাদের সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে কাজ করেন। নব্বইয়ের দশকে এমন একটি সিনেমা হলো ‘দিওয়ানা মুঝ সে নেহি’। কিন্তু এই সিনেমাটিও তেমন ব্যবসা সফল হয়নি। এজন্য দর্শকদের তেমন মনেও নেই। এখানে আমিরের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন তখনকার সুপারস্টার মাধুরী দীক্ষিত। এই সিনেমায় একজন পাগল প্রেমিকের ভ‚মিকায় অভিনয় করেন আমির। যেখানে তিনি বাধ্য করেন নায়িকাকে তার প্রেমে পড়তে। এ ছাড়া তিনি ‘আওয়াল নম্বর’ ছবিতেও অভিনয় করেন।

নব্বইয়ের দশক আমিরের জন্য এক কঠিন সময় ছিল। একের পর এক সিনেমা বলিউডে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এটি কোনো উঠতি অভিনেতার জন্য কোনোভাবেই ভালো কোনো সঙ্কেত ছিল না। সেই সময়ে দুটি সিনেমা জনপ্রিয় হতে পারত। সেগুলো হলো ‘দিল হ্যায় কি মানতা নেহি’ এবং ‘আফসানা পেয়ার কি’। কিন্তু সেই মুভির আগের ভার্সনগুলো ব্যবসা সফল হলেও আমির অভিনীতগুলো তেমনভাবে দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে টানেনি। সেই সময়ে আমির অভিনীত আরেকটি সিনেমা হলো ‘দিল’। দিল সিনেমাটি কেয়ামাত সে কেয়ামাত তাক সিনেমার সম্পূর্ণ বিপরীত।

তারপর ১৯৯৬ সালে ধারমেশ দর্শনের পরিচালনায় অন্যতম সেরা ব্যবসা সফল সিনেমা ‘রাজা হিন্দুস্তানি’ মুক্তি পায় যেখানে আমির খান কারিশমা কাপুরের বিপরীতে অভিনয় করেন। চোখ ধাঁধানো এই সিনেমার জন্য আমির খান ফিল্মফেয়ার ‘সেরা অভিনেতা’ হিসেবে মনোনীত হন। শুধু তাই নয়, ব্যবসা সফল এই সিনেমাটি নব্বইয়ের দশকের তৃতীয় সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমার খেতাব অর্জন করে নেয়। কিন্তু সিনেমাটি ব্যবসা সফল হলেও সমালোচকদের বেশ কড়া সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। সমালোচকদের মতে, এর কাহিনী বেশ নিম্নমানের। এরপর থেকেই মূলত আমির খান ধীরে ধীরে বলিউডের উঠতি তারকা হতে থাকেন। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে আরো কয়েকটি সিনেমায় ধীরে ধীরে তিনি আলোর মুখ দেখতে পান। সেগুলো হলো গুলাম, সারফারোস (১৯৯৯) এবং কানাডিয়ান আর্ট-হাউজ ফিল্ম ‘আর্থ’। এই সিনেমাগুলো আমির খানকে ধীরে ধীরে অবিশ্বাস্য আইকনে পরিণত করে।

নব্বইয়ের দশকের পর মূলত আমির খানের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। অসংখ্য ফ্লপ সিনেমার পর ২০০০ সাল থেকে আমির খান ভক্তদের একের পর এক হিট সিনেমা উপহার দিতে থাকেন এবং বলিউডের উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হন। সেই সঙ্গে তিনি কোটি মানুষের মন জয় করেন।

২০০১ সালে তার অভিনীত লাগান সিনেমাটি সেই বছরের সেরা সিনেমা ছিল। লাগান সিনেমাটির জন্য আমির খান ৭৪তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে ‘শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার সিনেমা’ ক্যাটাগরির জন্য মনোয়ন পায়। শুধু তাই নয়, লাগান আমির খানকে এনে দিয়েছে ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড এবং দ্বিতীয়বারের মতো ফিল্মফেয়ার ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেতা’র খেতাব। ২০০৬ সালে তার অভিনীত ‘রাং দে বাসান্তী’ সিনেমাটি ব্যবসা সফলের পাশাপাশি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে সেরা সিনেমার পুরস্কারটি পান।

২০০৭ সালে তিনি আবারও দর্শকদের মন জয় করেন ‘তারে যামিন পার’ এই সিনেমা দিয়ে। এই সিনেমাটি ২০০৮ সালে ভারতে জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিল। ২০০৮ সালে তিনি অভিনয় করেন গজনী সিনেমাটিতে। এই সিনেমাটি বলিউডের প্রথম হিন্দি সিনেমা যেটি ১০০ কোটির ঘরে পৌঁছে। ২০০৯ সালে তিনি অভিনয় করেন থ্রি ইডিয়েটস সিনেমায়। এটি শুধু ব্যবসা সফলই ছিল না বরং সমালোচকেরাও এর প্রশংসা করেন।

এই সিনেমাটি ৬টি ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ডসহ জাতীয় পুরস্কার নিজের ঘরে তুলে নেয়। এরপর ধবি ঘাট (২০১০) তালাশ (২০১২), ধুম থ্রি (২০১৩), পিকে (২০১৪), দাঙ্গাল (২০১৬), সিক্রেট সুপারস্টার (২০১৭) প্রত্যেকটি সিনেমায় আমির খান সফলতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য