রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করতে মিয়ানমারকে ‘দৃঢ় পদক্ষেপ’ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সংস্থা (ইউএসএআইডি)’র প্রধান মার্ক গ্রিন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞের কবলে পড়ে দেশ ছেড়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদেরকে প্রত্যাবাসনে উৎসাহিত করতে আন্তরিকতা প্রদর্শনের জন্যও আহ্বান জানানো হয়েছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন দিনের মিয়ানমার সফর শেষে মার্ক গ্রিন সাংবাদিকদের এসব কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আরও ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার সহায়তা দেবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। মিয়ানমার শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের বাঙালি মুসলিম আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে। তবে এবারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার এক পর্যায়ে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার।

তবে সেই চুক্তির পর বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও ধোঁয়াশা কাটছে না। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮ হাজার রোহিঙ্গার নাম প্রস্তাব করা হলেও মাত্র ৬০০ জনকে ফেরত নিতে চেয়েছে মিয়ানমার। তাদের পক্ষ থেকে প্রথম রোহিঙ্গা পরিবার ফেরত নেওয়ার দাবি করা হলেও ওই দাবি সাজানো বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, এমনকি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।

সম্প্রতি তিনদিনের মিয়ানমার সফরে যান যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সংস্থা (ইউএসএআইডি)’র প্রধান মার্ক গ্রিন। মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যও সফর করেছেন তিনি। পরিদর্শন করেছেন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের একটি শিবির। তিনদিনের মিয়ানমার সফর শেষে সাংবাদিকদের গ্রিন বলেন, আগের ধাপে বাংলাদেশ সফরের সময় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তারা মিয়ানমারের ফেরার ব্যাপারে ভীত।

প্রত্যাবাসনের আগে নিজেদের অধিকারের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানের নিশ্চয়তা চায় তারা। গ্রিন বলেন, ‘সেদিক থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করার জন্য সরকারের আন্তরিকতার বিষয়টি জরুরি হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনের জন্য যেসব শর্ত দিয়েছে তা পূরণে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আমরা ভীষণভাবে সরকারকে উদ্বুদ্ধ করব।’

গ্রিন জানান, মিয়ানমারে অনেক মুসলিম অসহায় জীবন-যাপন করছে। তারা ঠিক মতো স্বাস্থ্য সুরক্ষা পাচ্ছে না, মিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, চলাফেরার করার সুযোগ পাচ্ছে না, জীবনধারণের অবলম্বনটুকুও পাচ্ছে না। এ ধরনের অসহায়ত্বগুলো দূর করার জন্যও মিয়ানমার সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন মার্ক গ্রিন।

উল্লেখ্য, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের।

এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র,কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য