মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের অনুষ্ঠিতব্য বৈঠককে ঘিরে আলোচনায় এসেছে ‘লিবিয়া মডেল’। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে ‘লিবিয়া মডেল’ অনুসরণের কথা বলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে উত্তর কোরিয়া। সে প্রসঙ্গে মতামত জানিয়েছেন ট্রাম্পও। তবে ‘লিবিয়া মডেল’ বলতে বোল্টন কী বুঝিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া ও ট্রাম্পের মতামতের পর তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বোল্টন মূলত ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে হওয়া পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত চুক্তির কথা বলেছিলেন।

তবে উত্তর কোরিয়ার দাবি, বোল্টন ‘লিবিয়া মডেল’ দিয়ে ২০১১ সালে গাদ্দাফিকে হত্যার প্রতীক হাজির করেছে তাদের সামনে। সবশেষ ট্রাম্প তার বক্তব্যে বোল্টনের অবস্থানকে উ. কোরিয়ার সুরেই ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, লিবিয়াকে যেভাবে আমেরিকা ধ্বংস করেছে, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে সেরকম কোনও পরিকল্পনা নেই তার প্রশাসনের। তবে বৈঠক ব্যর্থ হলে কিমকে গাদ্দাফির পরিণতি বরণ করতে হতে পারে বলে পরোক্ষ হুমকিও দেন তিনি। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের ইন্ধনেই গাদ্দাফিকে হত্যা করা হয়। তাই প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পরোক্ষে কিমকে হত্যার হুমকি দিলেন কি না।

পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নে ট্রাম্প-কিম আলোচনাকে সামনে রেখে সিবিএস নিউজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে মিলিত হন মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোল্টন। ওই সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, ‘উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনায় আমরা ২০০৩-২০০৪ এর লিবিয়া মডেল অনুসরণ করতে যাচ্ছি’। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৩-২০০৪ এর ওই চুক্তি অনুযায়ী পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার্য যন্ত্রপাতিসহ আনুষঙ্গিক সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। গার্ডিয়ানের ভাষ্য, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পক্ষে মত দিয়েছেন বোল্টন।

তারা জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ইতোমধ্যেই সেই পথে হাঁটা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ৬ মাসের মধ্যে উত্তর কোরিয়াকে কিছু পারমাণবিক বোমা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিতে বলেছেন। ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছে, বিনিময়ে ‘সন্ত্রাসী সংগঠনকে সহায়তা দেওয়া দেশের তালিকা’ থেকে উত্তর কোরিয়ার নাম সরিয়ে নেওয়া হবে।

ওদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ার প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়া ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। সামরিক মহড়াটিকেই ‘আগ্রাসনের প্রস্তুতি’ আখ্যা দেয় তারা। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে গত বুধবার বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও পিয়ং ইয়ং তা বর্জন করে। সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিতব্য ট্রাম্প-কিম বৈঠক বর্জনেরও হুমকি দেয় তারা। বোল্টনের ‘লিবিয়া মডেল’ সংক্রান্ত মন্তব্যের ব্যাখ্যায় তারা পরমাণু সমেঝাতার বদলে পরোক্ষে লিবিয়ার পতন ও গাদ্দাফি হত্যার প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে মন্তব্য করা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভালো করেই জানা উচিত, আমাদের দেশ লিবিয়া কিংবা ইরাক না, যাদেরকে দুর্ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে’।

হোয়াইট হাউসের ভাষণে তিনি বলেছেন, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নে সফল বৈঠক হলে কিমই তার দেশ পরিচালনায় থাকবেন। তার দেশ অনেক সমৃদ্ধ হবে। ট্রাম্প বলেন ‘আপনি যদি দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে তাকান, তবে দেখতে পাবেন যে তাদের ব্যবসায় নিজেদের একটি মডেল দাঁড়িয়ে গেছে। তারা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং দারুণ।’ তেমন করেই উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন যুগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তবে তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোল্টনের মন্তব্যের বিষয়ে করা প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প পরোক্ষভাবে উত্তর কোরিয়াকে হুমকি দিয়েছেন।

বোল্টনের মন্তব্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছেন, ‘আপনারা যদি লক্ষ্য করেন তাহলে বুঝতে পারবেন যে গাদ্দাফির প্রসঙ্গে যা করা হয়েছে তা হচ্ছে সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক। আমরা সেখানে গিয়েছিলাম তাকে শাস্তি দিতে। যদি আমরা শেষ পর্যন্ত কোনও সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারি তাহলে ওই মডেলের কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু যদি আমরা চুক্তি করে ফেলি, তাহলে আমার ধারণা কিম জং উন খুবই খুশি হবেন।’ তার এই বক্তব্য নিরাপত্তা উপদেষ্টার বক্তব্যের বিরুদ্ধে যায় কি না জানতে চাইলে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বোল্টন খুব সম্ভবত চুক্তি সম্পন্নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য জটিলতার কথা ভেবে ওই কথা বলেছিলেন। কারণ দেশটিকে তো আমরা পরমাণু অস্ত্র রাখতে দিতে পারি না। আমরা কোনওভাবেই তা হতে দিতে পারি না।’

পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে ‘লিবিয়া মডেল’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট তুলে এনেছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের করা মন্তব্যের কথা। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের ঘোষণা দেওয়ার সময় পরোক্ষভাবে ইরাক যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট বুশ বলেছিলেন, ‘কথা ও কাজের মাধ্যমেই আমরা শত্রুপক্ষদের বুঝিয়ে দিয়েছি, আমরা আর কি কি পদক্ষেপ নিতে পারি।’ মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিজেও স্বীকার করেছিলেন, সাদ্দাম হুসেনের মৃত্যু তাকে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছিল।

মোট কথা, শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে রাজি না হলে সামরিক আগ্রাসনের পদক্ষেপও যুক্তরাষ্ট্র নিতে পারে। সেবার গাদ্দাফি রাজি হয়েছিলেন শান্তিপূর্ণভাবে পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করতে। এই প্রেক্ষাপটে গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বোল্টনের বক্তব্যের মূল সুর খুব সম্ভব ধরতে পারেননি ট্রাম্প। উত্তর কোরিয়ার মতো তিনিও ‘লিবিয়া মডেল’ বলতে সামরিক আগ্রাসন ও গাদ্দাফির হত্যাকাণ্ডকে সামনে এনে বক্তব্য দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করা সাবেক মধ্যস্থতাকারী ও বর্তমানে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্র-কোরিয়া ইন্সটিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো জোয়েল উইটও একে কিমের প্রতি খুনের পরোক্ষ হুমকি হিসেবেই দেখছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘সম্মেলনের মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি থাকতে হুমকি দেওয়া যথার্থ নয়।’

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য