সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের এক স্বজনের একটি সুরম্য অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে অভিযান চালিয়েছে দেশটির পুলিশ।

সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথি খুঁজতে রাজধানী কুয়ালালামপুরের ওই অ্যাপার্ন্টমেন্ট ব্লকে অভিযান চালানো হয় বলে জানিয়েছে মালয়েশীয় পুলিশের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের।

স্পর্শকাতর কোনো নথি থেকে থাকলে সেগুলো দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হতে পারে বলে শঙ্কা দেশটির নবনির্বাচিত সরকারের।

নাজিব ও তার স্ত্রীর দেশ ত্যাগে সরকারের নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারির অল্প সময়ের মধ্যে এ অভিযানটি চালানো হল।

রাষ্ট্রীয় তহবিল ওয়ানএমডিবির অর্থ তছরুপ করার অভিযোগ থাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ।

নাজিবের স্ত্রী রোসমাহ মানসুরের নকশাকার হাতব্যাগ এবং অন্যান্য জিনিস বহন করা যায় এমন কয়েক ডজন বাক্স একটি সরকারি গাড়িতে করে অ্যাপার্টমেন্টটিতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ সেখানে অভিযান চালায় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সর্বগ্রাসী দুর্নীতি নিয়ে জনমনে সৃষ্ট ক্ষোভ ও সন্দেহই বুধবারের নির্বাচনে কয়েক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা বারিসান ন্যাসিওনাল (বিএন) জোটের পরাজয়ের অন্যতম কারণ বলে ধারণা পর্যবেক্ষকদের।

নাজিব অবশ্য শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

পুলিশি অভিযান বিষয়ে নাজিবের মুখপাত্রের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। শনিবার রাতের ঘটনা নিয়ে নাজিব, তার স্ত্রী, পরিবারের সদস্য কিংবা ঘনিষ্ঠদের কারও মন্তব্যও জানতে পারেনি রয়টার্স।

নতুন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ সংবাদ সম্মেলন করে তার নতুন মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের নাম ঘোষণার অল্প সময়ই পরই প্রায় ২০ জন পুলিশ সদস্যকে কুয়ালালামপুরের ওই অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের প্যাভেলিয়নের লবি দিয়ে ঢুকতে দেখা যায় বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

তাদের সঙ্গে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাদা পোশাকে থাকা কয়েক ডজন সদস্যও ছিলেন।

নাজিব সমর্থক ধনী মালয়েশীয় ব্যবসায়ী ডেসমন্ড লিম ওই ভবনটির মালিক বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

“আমরা সরকারি কিছু নথি খুঁজছি, যা সম্ভবত অবৈধ উপায়ে নেওয়া হয়েছে। স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ এসব নথি দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সরকার,” বলেন এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা।

গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার দায়িত্বপ্রাপ্ত না হওয়ায় নিজের নাম বলতে রাজি হননি তিনি।

অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ কোনো নথির সন্ধান পাওয়া গেছে কি না তাও বলতে রাজি হননি তিনি। তবে অভিযান ‘চলমান’ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

পুলিশি অভিযানের সময় নাজিবের স্বজনরা ওই অ্যাপার্টমেন্টেই ছিলেন, যদিও তাদের নাম-পরিচয় জানাননি কর্মকর্তারা।

কুয়ালালামপুরের পুলিশ প্রধানের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলেও তিনি তার জবাব দেননি। তার মুখপাত্রও এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি।

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছুটি কাটাতে শনিবার দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, নাজিবের এমন মন্তব্যের কিছুক্ষণ পরই তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার খবর আসে।

টুইটারে পরে সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীও তার দেশ ছাড়ে নিষেধাজ্ঞার খবর নিশ্চিত করেন। কী কারণে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে কর্তৃপক্ষ তা না জানালেও নাজিব বলেছেন, তিনি এ নির্দেশ মেনে চলবেন।

নাজিবের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ওয়ানএমডিবি থেকে ৭০ কোটি মার্কিন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ আছে।

রাজধানী কুয়ালালামপুরকে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার পাশাপাশি কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি গতিশীল করার পরিকল্পনায় ২০০৯ সালে এই ওয়ানএমডিবি তহবিল গঠন করা হয়েছিল। তহবিলে তিনশ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ছিল।

ওই তহবিলের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে মালয়েশীয়দের প্রতারিত করা হচ্ছে, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রমাণ থাকার কথা জানিয়ে অন্তত একশ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করার উদ্যোগ নেয়।

ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারি প্রকাশের পর মাহাথির তার এক সময়ের পছন্দের প্রার্থী নাজিবকে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

কিন্তু নাজিব ক্ষমতা ছাড়তে রাজি না হওয়ায় নিজের সাবেক দলের বিপক্ষে গিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে জোট বেধে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন বয়সের কারণে রাজনীতিকে বিদায় জানানো মাহাথির।

মাহাথিরের জনপ্রিয়তার জোরেই বুধবারের জাতীয় নির্বাচনে পাকাতান হারাপানের (অ্যালায়েন্স অব হোপ) বড় জয় পায়। ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর গত ৬১ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকা মালয়েশিয়ায় বারিসান ন্যাসিওনালের (বিএন) ভরাডুবি হয়। বিএন’র হয়ে মাহাথিরই ২২ বছর মালয়েশিয়া শাসন করেছিলেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য