রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত করার অনুমতি চেয়েছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। তবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, বিষয়টি অভ্যন্তরীন। মিয়ানামারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাং ফেসবুকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই কথা জানিয়েছেন।

মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতী জানায়, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সফররত প্রতিনিধি দলের ওলোফ স্কুগ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে তিনি মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নিরাপত্তা পরিষদের উদ্বেগের কথা জানান। জাতিসংঘ এসব ঘটনা তদন্ত করতে চায় জানিয়ে তিনি এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর মত জানতে চান।

সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাং জাতিসংঘের কূটনীতিকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানান, বিষয়টি অভ্যন্তরীন। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জড়ানোর জন্য বুথিয়াডং ও মংডু শহরসহ উত্তর রাখাইনে নিপীড়নের বিষয়টি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দ্বারা অতিরঞ্জিত করা হয়েছে।

মিয়ানমার সেনাপ্রধান জানান, সরকার ও সেনাবাহিনী ২০১২ ও ২০১৬ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত করেছে এবং জড়িতদের শাস্তি দিয়েছে।

মিন অং হ্লাং দাবি করেন, কয়েকটি সংস্থা মিয়ানমার আসে এবং তারা যা চায় তা করার চেষ্টা করে। দেশে এসবের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, আমাদের দিক থেকে আমরা এরই মধ্যে যথেষ্ট তদন্ত করেছি। কিন্তু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনীর এখতিয়ার নয়। সরকারের শুধু এই ক্ষমতা রয়েছে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে চারদিনের সফর শেষে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এই অবস্থান জানালেন। প্রতিনিধি দলটি প্রথমে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে। গত বছর আগস্ট থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংসতার মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সাত লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন।

জাতিসংঘের তদন্তের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে সংস্থাটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কূটনীতিক কেলি কারি জানান, বাংলাদেশে সাত লাখ মানুষের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি মোটেই তা নয়। এমন পরিস্থিতির দাবি হচ্ছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ পদক্ষেপ নেবে। কারণ এটা আন্তর্জাতিক বিষয়।

প্রতিনিধি দলের আরেক সদস্য কাইরাত উমারভ জানান, অনেক রোহিঙ্গা তাদের কাছে ধর্ষণের ভয়াবহ ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন। মিয়ানমার তদন্তে সায় দিক চান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের জন্য এসব বিশ্বাস করাই কঠিন ছিল।

মিয়ানমার সেনাপ্রধান বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, দেশটি বৌদ্ধ প্রধান হওয়ার কারণে ধর্ষণের অভিযোগ অনেক মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে ধর্ষণে মিয়ানমারের সেনারা জড়িত। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ১ হাজার ১১৬টি ধর্ষণের অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে মাত্র ১৬টি ঘটনায় সেনারা জড়িত ছিল। সেনাবাহিনী তাদের সবাইকে শাস্তি দিয়েছে। এমনকি ২০১৭ সালে ১ হাজার ৪২২টি ধর্ষণের অভিযোগের মধ্যে সেনারা মাত্র ১৭টি ঘটনায় জড়িত ছিল। তাদেরকেও ২০ বছরের কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

সেনাপ্রধান আরও দাবি করেন, রাখাইনের স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সেনাবাহিনীর দায়িত্ব। সশস্ত্র ব্যক্তিরা যদি পুলিশ ও স্থানীয়দের উপর হামলা না চালাত তাহলে সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করত না। ২০১২-২০১৮ সাল পর্যন্ত বাঙালিদের হামলায় মোট ৭২ জন স্থানীয় মানুষ নিহত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। দেশটি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী বা বাঙালি হিসেবে মনে করে। জাতিগত স্বীকৃতি না থাকায় মিয়ানমারের নাগরিকত্বও দেওয়া হয় না রোহিঙ্গাদের।

মিয়ানমার সেনাপ্রধান দাবি করেন, অনেক কারণেই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। পুলিশ ফাঁড়ি, সেনা ও স্থানীয়দের উপর হামলায় জড়িত থাকায় অনেকে বাংলাদেশে পালিয়েছে। এছাড়া আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) তাদের রাখাইনে না ফেরার হুমকি দিয়েছে। আরসা চায় না বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে না ফিরুক। তাই তারা রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরলে হত্যার হুমকি দিয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, আরসা রোহিঙ্গাদের রাখাইনে অবস্থান করলে হত্যার হুমকি দিয়েছে। ফলে অনেকেই বাংলাদেশে পালিয়েছে।

সেনাপ্রধান বিবৃতিতে দাবি করেন, রাখাইনে সহিংসতা শুরু হয় ২০১২ সালে। ২০১৬ সালে কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার পর সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নেয়। পরে ২০১৭ সালে আরসা পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে পাল্টা সামরিক অভিযান জোরদার করে। মংডু ও বুথিয়াডং শহরের পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল এবং সেখান থেকে সেনাদের প্রত্যাহার করে দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গারা যদি মিয়ানমারে ফিরতে চায় তাহলে সেনাবাহিনী তাদের সহযোগিতা করবে বলে দাবি করেন সেনাপ্রধান। তিনি আরও জানান, সেনা অনুমোদিত সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরলে কোনও বিপদের মুখে পড়তে হবে না। এই দুই শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব যদি সেনাবাহিনীকে আবার নিতে হয় তাহলে প্রথমে সরকারের অনুমতি চাওয়া হবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য