-আজহারুল আজাদ জুয়েল ও প্রিয়বালা বিশ্বাসঃ- একাত্তরের শহীদদের কথা মানুষ ভুলে যাচ্ছে। যেখানে গণহত্যা হয়েছে, সেই এলাকায় বসাবসরত বর্তমান প্রজন্মের মানুষেরাই সে কথা জানছেনা। জানার চেষ্টাও করে না। অনেক সময় জানলেও বলার চেষ্টা করে না! কোথায় যেন একটা ভয় কাজ করর কারো কারো মধ্যে। সেদিক থেকে খানসামার শহীদ অমিয় গুহর ভাগ্য অনেকটা ভাল। একাত্তরে নির্মম আর নিষ্ঠুর গণহত্যার শিকার হওয়া এই মহান মানুষটির কথা অনেকে মনে রেখেছেন। আনুষ্ঠানিকতা না হলেও তাকে আলোচনার মধ্যে রেখেছেন।

খানসামা বাজার এলাকার বাসিন্দা মৃত গিয়াসউদ্দিনের পুত্র মখলেছার রহমান (৫৮) বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ছেলে মানুষ ছিলাম। পাকিস্তানিদের ভয়ে বাবা, মা’র সাথে পালিয়ে গিয়েছিলাম। তাই তখনকার অনেক কথা বলতে পারব না। তবে এটা জানি যে, অমিয় গুহ বাবার বন্ধু ছিলেন। এক সাথে রাজনীতি করতেন। থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বাপ-দাদার কাছে শুনেছি যে, খান সেনারা আওয়ামী লীগের এই ধরণের নেতাদের খুঁজছিল। তারা জানতে চাইছিল ইদুর কাঁহা। অমিয় গুহদের তারা ইদুর মনে করত। খান সেনারা তাকে ধরে নিয়ে আনার পর ‘যাত্রা’ করে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিল। তাকে হত্যার পর লাশ খাতামারি ব্রিজে ফেলে দিয়েছিল।

দিনাজপুরের ভেতরে দক্ষিণ প্রান্তের উপজেলা খানসামা। যার সীমান্ত আছে বীরগঞ্জ, দেবীগঞ্জ, নীলফামারী, চিরিরবন্দর ও দিনাজপুর সদরের সাথে। ১৭৯ বর্গ কিলোমিটার এবং ৬টি ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয়ে গঠিত খানসামা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে একাধিক গণহত্যা ঘটেছে। নিষ্ঠুরতম নির্যাতন হয়েছে। যার শিকার হয়েছিলেন তৎকালীন খানসামা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অমিয় কুমার গুহ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত ছয় দফার আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, মার্চের অসহযোগ আন্দোলন সহ সকল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই অকুতোভয় ত্যাগী নেতা।

এই উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা ছিলেন গোলাম রহমান শাহ, যিনি ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে এমএনএ হয়েছিলেন। এর পরের সারিতে ছিলেন অমিয় কুমার গুহ, মোঃ নাসিরউদ্দিন (মুক্তিযুদ্ধকালে খানসামা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি), এ্যাডভোকেট জহিরউদ্দিন শাহ, শাহ মোঃ আব্দুল জব্বার, আব্দুল জব্বার হেড মাষ্টার, মইনউদ্দিন সরকার, সুকুমার রায় (জয়গঞ্জ)। নেতৃবৃন্দের মধ্যে শুধু অমিয় কুমার গুহই হত্যার শিকার হন শুধুমাত্র হিন্দু হওয়ার কারণে। খানসামায় হিন্দু-মুসলিমসহ সর্ব শ্রেণীর মানুষ পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের হাতে গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দু ধর্মবলম্বীদের প্রতি নির্যাতনের মাত্র অতিমাত্রায় বেশি ছিল।

খানসামার দুটো প্রধান কেন্দ্র পাকেরহাট এবং খানসামা বাজার। এ দুই বাজারের দূরত্ব ৮-৯ কিলোমিটার। মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ের আন্দোলন সংগ্রামে অমিয়গুহ মূলত খানসামা বাজার এলাকার নেতৃত্ব দিতেন। পাকেরহাট এলাকায় নেতৃত্ব দিতেন মোঃ নাসিরউদ্দিন। পুরো থানায় মূল নেতৃত্বে ছিলেন গোলাম রহমান শাহ এমএনএ। তিনি যেভাবে বলতেন,প্রধানত সেভাবেই খানসামায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি পরিচালিত হতো।

৭ মার্চ এর ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত হতে বলেন। পাড়া-মহল্লায় সংগ্রাম কমিটি গঠণ করতে বলেন। এর পরদিন ৮ মার্চ পাকেরহাটের আব্দুল জব্বার হেডমাষ্টারের বাড়িতে অনুষ্ঠিত এক সভায় শাহ মোঃ গোলাম রহমান এমএনএ’কে আহ্বায়ক করে সংগ্রাম কমিটি গঠণ করা হয়। সংগ্রাম কমিটির সদস্য ছিলেন মোঃ নাসিরউদ্দিন (খানসামা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি), অমিয় কুমার গুহ (খানসামা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক), এ্যাডভোকেট জহিরউদ্দিন শাহ, শাহ মোঃ আব্দুল জব্বার, আব্দুল জব্বার হেড মাষ্টার, মইনউদ্দিন সরকার, সুকুমার রায় (জয়গঞ্জ), ডাঃ শফিউদ্দিন আহমেদ(পাকেরহাট), জিন্নাত হোসেন চৌধুরী, আব্দুল লতিফ চৌধুরী মাষ্টার (হাসিমপুর), দলিলউদ্দিন চৌধুরী, আকবর আলী শাহ, আজম আলী শাহ, তমিজউদ্দিন সরকার, খোকারাম রায়, হাজী তাজিমউদ্দিন, ফজলার রহমান, আফাজউদ্দিন শাহ, ডাঃ গোবিন্দ চন্দ্র রায়, আব্দুল জব্বার সরকার (দুহসুহ) প্রমুখ।

আওয়ামী লীগ এবং সংগ্রাম কমিটির নেতা হিসেবে অমিয় গুহ সক্রিয় ছিলেন সার্বক্ষণিক ভাবে। খানসামা বাজারে তার নিজস্ব ব্যবসায়িক গদি ও বাজার সংলগ্ন বানিয়াপাড়ায় নিজস্ব দোতালা বাড়ি ছিল। বাড়ি ও গদি দুটোই ছিল রাজনীতির আখড়া। নেতা-কর্মদের ভিড় থাকত দুটোতেই। তার হাতের লেখা খুবই সুন্দর, স্বচ্ছ ছিল। এ কারণে অনেকে তার কাছ থেকে বিভিন্ন ধরণের দলিল লিখে নিতেন।

অমিয় কুমার গুহ পুরো খানসামা জুড়ে ছুটে বেরিয়েছেন অসহযোগ আন্দোলনসহ স্বাধীনতার পক্ষের সকল আন্দোলন সফল করার জন্য। সে কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসরদের রোসানলের শিকার হন। স্বাধীনতা বিরোধী মুসলিম লীগ ও জামায়াতের লোকজন ৬নং গোয়ালডিহি ইউপি চেয়ারম্যান ও পীস কমিটির চেয়ারম্যান সিরাজউদ্দিনের নেতৃত্বে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে থানা হাজতে তিন দিন আটকে রাখার পর পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়। পাকিস্তানি সেনারা তাকে জীপের সাথে বেঁধে টানতে টানতে নীলফামারীর দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় খাতামারি ব্রিজের কাছে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে লাশ ইছামতি নদীতে ফেলে দেয়।

অমিয় গুহ হত্যাকান্ডের ঘটনায় খানসামা উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শফিউল আযম লায়ন বলেন, অমিয় কুমার গুহকে ১৯৭১ সালের জুলাইয়ের পরে হত্যা করা হয়। তিনি খানসামা থেকে পালিয়ে ৬নং গোয়ালডিহি ইউনিয়নের ডুবুলিয়া গ্রামে আওয়ামী লীগ নেতা খোকারাম বাবুর বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। ঐ গ্রাম তখনকার হিসেবে একটা প্রত্যন্ত গ্রাম ছিল। গোয়ালডিহি ইউপি ও পীস কমিটির চেয়ারম্যান সিরাজউদ্দিন টের পেয়ে ঐ বাড়ি ঘেরাও করেন। খোকা বাবু পালিয়ে যেতে পারলেও অমিয় গুহ ধরা পড়েন। তাকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তার হাত পিছমোরা করে বেঁধে নীলফামারী যাওয়ার পথে খাটামারি ব্রিজের কাছে প্রকাশ্য দিবালোকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। অমিয় গুহ তখন মৃত্যু যন্ত্রনায় ভারি শরীর নিয়ে ৫-৭ হাত করে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছিলেন।

হত্যাকান্ডের ঘটনায় অমিয় গুহর ছেলে কাজল কুমার গুহ (৫৫) বলেন, বাবার হাত দিয়ে এখানে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে এবং মৃত্যুকাল পর্যন্ত ঐ দলের সাথেই ছিলেন। তার নেতৃত্বে খানসামায় আন্দোলন, কর্মসুচি পরিচালিত হয়েছে। ৬৯ এর গণ অভুত্থানের সময় গোলাম রহমান, শাহ মাহতাব, সতীশ চন্দ্র রায় প্রমুখ নেতাসহ এক সাথে ছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে গোলাম রহমান এমপি নির্বাচিত হন। এরপর পরিস্থিতি অরাজক হলে সর্বদলীয় প্রতিরোধ কমিটি হয়। কিন্তু প্রতিরোধ কমিটির হাতে তো অস্ত্র ছিল না। বাঙালি ইপিআর যারা তাদের কিছু অস্ত্র ছিল। তারা কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করেছে। কিন্তু খান সেনাদের সামনে সেটা কিছুই ছিল না। খান সেনারা এগিয়ে এলে আমাদের সবাই যে যার মত আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। বাবা ৬নং গোয়ালডিহি ইউনিয়নের আত্মগোপন করেছিলেন। সেখান থেকে মুসলিম লীগ, জামায়াত, রাজাকাররা বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে তিন দিন থানায় আটক করে রাখার পর পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়া হয়। ইছামতি নদীতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়।। থানা থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় তার পরনে একটি গামছা ব্যতিত কোন কাপড় ছিল না। তার কোমড়ে দড়ি বেধে গাড়ির সাথে জুড়ে দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়। তাকে বহু নির্যাতন করা হয়। বেয়নেট দিয়ে হুল মারা হয়। তার সারা শরীর রক্তাক্ত করা হয়। এরপর তাকে হত্যা করে লাশ ইছামতি নদীতে ফেলে দেয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আজ পর্যন্ত বাবা শহীদের মর্যাদা পায় নাই এবং আমাদেরকেও শহীদ পরিবার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয় নাই। একটি কুচক্রি মহলের ষড়যন্ত্রের কারণে বাবা তার প্রাপ্য মর্যাদা হতে বঞ্চিত থাকছে এটা আমাদের জন্য বড় বেদনার।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ব্যক্তিদের নাম নিতে চায় না, এমন মানুষের সংখ্যা এই মুহুর্তে বেশি বলে আমার ধারণা! বিশেষ করে যারা গণহত্যার শিকার হয়েছেন তাদেরকে ভুলে যেতে পারলেই যেন সমাজ বাঁচে, জাতি বাঁচে! এমন আবহ ছিল বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগে পর্যন্ত। মুক্তিযুদ্ধের কথা বললে অনেকের মধ্যে নাক ছিটকানো ভাব দেখা যেত। এখনো যে এই পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়েছে এমন নয়। তবে আশার কথা, পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, মানুষ মুক্তিযুদ্ধ এবং একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে। -আজহারুল আজাদ জুয়েল- সাংবাদিক, কলামিস্ট, প্রিয়বালা বিশ^াস- নির্বাহি পরিচালক, শারি।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অমিয় গুহর চশমা। চশমাটি রয়েছে শহীদের
পরিবারের কাছে। এই চশমা অচিরেই যাবে খুলনায় ড. মুনতাসীর
মামুনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত গণহত্যা যাদুঘরে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য