মিয়ানমার দাবি করেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের দেওয়া আবেদনপত্র এখনও রোহিঙ্গাদের দেয়নি বাংলাদেশ। এমনকি রোহিঙ্গাদের শিখিয়ে পড়িয়ে ১৩ দফা দাবি পেশ করানোর মতো ঘটনা ঘটানো হয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী উইন মিয়াট আয়ের নেতৃত্বাধীন দশ সদস্যের প্রতিনিধি দলের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে ফিরে যাওয়ার পর এই অভিযোগ তুললো দেশটি। সমাজকল্যাণমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতী এখবর জানিয়েছে। ইরাবতী দাবি করেছে, মিয়ানমারের বাংলাদেশ দূতাবাসে এ বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য যোগাযোগ করা হলেও, সেখান থেকে কোনও উত্তর দেওয়া হয়নি।

গতবছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। মিয়ানমার শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের বাঙালি মুসলিম আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে। তবে এবারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার এক পর্যায়ে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে সেই চুক্তির পর বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও ধোঁয়াশা কাটছে না। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮ হাজার রোহিঙ্গার নাম প্রস্তাব করা হলেও মাত্র ৬০০ জনকে ফেরত নিতে চেয়েছে মিয়ানমার। সম্প্রতি দেশটির পক্ষ থেকে প্রথম রোহিঙ্গা পরিবার ফেরত নেওয়ার দাবি করা হলেও ওই দাবি সাজানো বলে অভিযোগ উঠেছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জানুয়ারিতে সম্পন্ন হওয়া মিয়ানমার-বাংলাদেশ চুক্তির আওতায় এখনও একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা-নেপিদো চুক্তি সম্পন্ন হলেও নানা অজুহাতে রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে প্রত্যাবাসনের গতি। চুক্তির আগেই বিশেষজ্ঞরা সংশয় প্রকাশ করেছিলেন এর ফলাফল নিয়ে। আন্তর্জাতিক চাপ থেকে বাঁচতেই মিয়ানমার প্রত্যাবাসনে রাজি হয়েছে বলে মত দিয়েছিলেন তারা। চুক্তির পরও রাখাইনে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। বুলডোজারে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের নজির। খবর মিলেছে সেখানে আদর্শ বৌদ্ধ গ্রাম নির্মাণ চলমান থাকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রত্যাবাসন চুক্তি ছিল একটি প্রচারণা কৌশল, যার মধ্য দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ আড়ালের চেষ্টা করেছে মিয়ানমার।

ইরাবতীর খবরে বলা হয়েছে, গত ডিসেম্বরে প্রত্যাবাসনে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের পূরণের জন্য একটি আবেদনপত্র বাংলাদেশকে হস্তান্তর করেছিল মিয়ানমার। মিয়ানমারের বাসিন্দা হিসেবে রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য উভয় দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ সম্মত হওয়ার পরই এই আবেদনপত্র দেওয়া হয়। পরের মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল কিউ সোয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে জানানো যে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কয়েকশ’ আরসা সদস্য আত্মগোপন করে রয়েছে বলে মনে মিয়ানমার। ওই সময়ে বাংলাদেশ তার কাছে ৮ হাজার ৩০২ জন প্রত্যাবাসনে ইচ্ছুক রোহিঙ্গার সাধারণ আবেদনপত্র হস্তান্তর করেছিল।

মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলটি এপ্রিলের ১১-১৩ তারিখ কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সফর নিয়ে ইয়াঙ্গুনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী উইন মিয়াট আয়ে জানান, শরণার্থী শিবিরের রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে দেখা করেছে এবং জানিয়েছে তারা প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত কোনও আবেদনপত্র পায়নি। তিনি বলেন, ‘কেউ এই আবেদনপত্র সম্পর্কে জানে না।’

উইন মিয়াট দাবি করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও স্বীকার করেছেন ওই আবেদনপত্রগুলো প্রত্যাবাসনের আবেদনপত্র নয়, যেগুলোর বিষয়ে দুই দেশের সরকারের একমত হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তারাও স্বীকার করেছিলেন তাদের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের হাতে দেওয়া ফর্মগুলো প্রত্যাবাসনের জন্য দেওয়া মিয়ানমারের আবেদনপত্র নয়।’

মিয়ানমারের সমাজকল্যাণমন্ত্রীর দাবি, রোহিঙ্গাদের যথাযথ আবেদনপত্র দিতে এবং সেগুলো রোহিঙ্গাদের দিয়ে পূরণ করিয়ে মিয়ানমারের হাতে ফেরত দিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছিলেন। তবে বাংলাদেশ কেন আবেদনপত্র রোহিঙ্গাদের দেয়নি, এই বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাব দেননি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।

রোহিঙ্গা শিবির সফর শেষে ফিরে যাওয়া দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, রোহিঙ্গা ইমাম, প্রত্যাবাসনের জন্য তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হিন্দুদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজন করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলেও বাংলাদেশ সে অনুরোধ রাখেনি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হিন্দু শরণার্থীদের শিবির অনেক দূরে। বাংলাদেশ অসহযোগিতা করেছে দাবি করে প্রতিনিধি হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করা ইউ হ্লা তুন বলেছেন, অথচ হিন্দুদের শরণার্থী শিবির কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার পথেই পড়ে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রী উইন মিয়াট দাবি করেন, শরণার্থী শিবিরের প্রতিনিধিরা মিয়ানমারের ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) সম্পর্কে খুব কম জানে। কার্ডের সুবিধা বর্ণনায় মুখর মন্ত্রীর দাবি, তিনি রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন, ওই কার্ড স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা, ব্যবসা করা, শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক সীমানা পাড়ি দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য কাজে লাগে। কার্ডধারীরা পাঁচ মাস পর নাগরিকত্বের আবেদন করার যোগ্য হয়। তার ভাষ্য, ‘এনভিসি থাকার সুবিধা সম্পর্কে তাদের বেশিরভাগেরই কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই।’ যদিও মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জাতি হিসেবে পরিচয় দেওয়া কাউকে নাগরিকত্ব দেয় না। কারণ দেশটির সরকার রোহিঙ্গাদের জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।

সফরে আসা মিয়ানমারের দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেখানে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিররা তাদের কাছে ১৩ দফা দাবি পেশ করেছিল। এসব দাবির মধ্যে ছিল, সম্পত্তির অধিকার, শিক্ষার অধিকার, জাতিগত পরিচয়ের রক্ষার আধিকার নিশ্চিত করা। মন্ত্রীর ধারণা, ওইসব দাবি উপস্থাপন করার জন্য ‘কেউ তাদের ভালোভাবে শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছিল’। তবে কারা তারা কারা জানতে চাইলে মন্ত্রী কোনও উত্তর দেননি। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গারা তাকে জানিয়েছেন যে তারা যত দ্রুত সম্ভব সবাই মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য