আইনী জটিলতায় চার বছরের বেশী সময় ধরে মর্গে থাকা ধর্মান্তরিত নীলফামারীর ডোমার উপজেলার হোসনে আরা ইসলামের লাশ ইসলাম ধর্মের রীতি অনুযায়ী দাফনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর তিন দিনের মধ্যে লাশ দাফন করতে হবে। জেলা প্রশাসককে ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির মাধ্যমে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলেছেন আদালত।

একইসঙ্গে দাফনের আগে হোসনে আরার মরদেহ তার বাবার পরিবারকে দেখার সুযোগ দিতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। মামলা বিবরনে জানা যায়, জেলার ডোমার উপজেলার খামার বমুনিয়া গ্রামের অক্ষয় কুমার রায় মাস্টারের মেয়ে কলেজছাত্রী লিপা রানী রায়ের সঙ্গে বোড়াগাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব বোড়াগাড়ী গ্রামের জহুরুল ইসলাম মেম্বারের ছেলে হুমায়ুন ফরিদ লাইজু ইসলামের (২৩) প্রেমের সর্ম্পক ছিল।

তারা ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর বিয়ে করে। এজন্য লিপা ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক মোছা. হোসনে আরা ইসলাম নাম ধারণ এবং নীলফামারী নোটারী পাবলিক ক্লাবের এভিডেভিটের মাধ্যমে ২ লাখ ১ হাজার ৫০১ টাকা দেনমোহরে হুমায়ুন ফরিদ লাইজু ইসলামকে বিয়ে করে। এরপর তারা স্বামী-স্ত্রী হিসাবে বসবাস করে আসছিল।

এ অবস্থায় মেয়েটির বাবা অক্ষয় কুমার রায় ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর বাদী হয়ে নীলফামারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। মামলার পর মেয়ে ও ছেলে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে সকল কাগজপত্রসহ আদালতে হাজির হয়ে জবানবন্দি দেয়। ফলে আদালত ছেলে-মেয়েকে হেফাজতে রেখে মামলার সার্বিক বিবেচনা করে অপহরণ মামলা খারিজ করে দেন।

এরপর অক্ষয় কুমার রায় মামলার খারিজ আপিলে তার মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও পাগল দাবী করে আদালতে কাগজ পত্র দাখিল করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে শারীরিক পরীক্ষার জন্য মেয়েটিকে রাজশাহী সেফহোমে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এ অবস্থায় ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি মেয়েটির স্বামী হুমায়ূন ফরিদ লাইজু ইসলাম বিষপান করে আত্মহত্যা করে বলে এলাকায় প্রচার পায়। যা এখনো রহস্যাবৃত।

এরপর লাইজুর আত্মহত্যার বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করে অক্ষয় কুমার মেয়েকে তার জিম্মায় নিতে আদালতে আবেদন করেন। আদালত তা মঞ্জুর করলে ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি মেয়েকে নিয়ে বাড়ীতে নিয়ে নিজ জিম্মায় রাখেন বাবা। তবে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালের ১০ মার্চ দুপুরে বাবার বাড়িতে কীটনাশক পান করে মেয়েটি। তাকে ডোমার উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে মারা যায়।

পুলিশ হাসপাতাল হতে মেয়েটির লাশ রাতেই উদ্ধার করে। পরের দিন লাশ জেলার মর্গে ময়নাতদন্ত করা হয়। ওইদিন মেয়েটির শ্বশুর জহুরুল ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক দাফনে ও বাবা অক্ষয় কুমার রায় হিন্দু শাস্ত্রে সৎকারের জন্য তাৎক্ষণিকভাব জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (জেলা প্রশাসক) আদালতে উভয়পক্ষের শুনানি চলে ওই দিনসন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। ওই শুনানিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিষয়টি পুলিশকে একটি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদেশ দেন।

ডোমার থানার তৎকালিন ওসি (তদন্ত) আইউব আলী মেয়ে ও ছেলে পক্ষকে ডেকে বিষয়টি নিজেদের মধ্যে সমাধান পূর্বক ব্যাবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থানে অটুট থাকায় ডোমার থানা পুলিশ ১২ মার্চ/২০১৪ তােিখ আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। আদালত মেয়েটির মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংরক্ষণের আদেশ দেন।

ফলে বৃহস্পতিবার ১৩ এপ্রিল/২০১৮) পর্যন্ত মেয়েটির মরদেহ ৪ বছর ১ মাস ১ দিন ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণ রয়েছে। সূত্র মতে, মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য হাইকোর্টে আবেদন করেছিল মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র। এই আবেদনের পর দুই কার্যদিবসে হাইকোর্ট এই আদেশ দেন বলে জানা গেছে।

রায়ের সময় আদালতে হোসনে আরা ইসলামের শ্বশুর জহুরুল ইসলাম উপস্থিত থাকলেও মেয়েটির বাবা অক্ষয় কুমার রায় নিজ এলাকায় ছিলেন। তিনি গ্রামের বামুনিয়া নাঠুয়াপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। রায়ে জহুরুল ইসলাম সন্তোষ প্রকাশ করলেও তার বাবা অক্ষয় কুমার রায় কোন মন্তব্য করেন নি। এ ব্যাপারে নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খালেদ রহীম জানান, উচ্চ আদালতের নির্দেশ ও আদেশের পত্র হাতে পাওয়ার পর আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য