গাজার সহিংস পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষকে সতর্ক করেছেন হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদা। তিনি বলেন, গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর যে ধরনের সহিংসতা চালানো হচ্ছে তা রোম স্ট্যাচু অনুযায়ী অপরাধের শামিল। প্রসিকিউটর কার্যালয় থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে জানিয়ে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন ফাতু। গাজা সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইয়াসির মুর্তজার দাফন সম্পন্ন হওয়ার একদিন পর রবিবার (৮ এপ্রিল) এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন ফাতু।

ইসরায়েলি হুমকি অগ্রাহ্য করে ভূমি দিবস উপলক্ষ্যে টানা ছয় সপ্তাহের কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্বে শুক্রবার গাজা সীমান্তে জড়ো হয় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের ওপর গুলি ছুড়লে নিহত হয় ৯ ফিলিস্তিনি। ভূমি দিবসের দুই সপ্তাহের কর্মসূচিতে এই নিয়ে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১-এ। শুক্রবার সাংবাদিক ইয়াসির মুর্তজা প্রেস লেখা জ্যাকেট পরে খান ইউনিস সীমান্তে ছবি তোলার সময় পেটে গুলিবিদ্ধ হন। পরের দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। শনিবার তার দাফন সম্পন্ন।

গাজায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদা একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২০১৮ সালের ৩০ মার্চ থেকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর হাতে অন্তত ২৭ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১ হাজার জনেরও বেশি মানুষ। এদের অনেকে তাজা গুলি ও রাবার বুলেটে বিদ্ধ হয়েছে।’

বিবৃতিতে ফাতু আরও বলেন, ‘গাজায় যে ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে তেমন করে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সহিংসতা চালানো রোম স্ট্যাচু অনুযায়ী অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। এক্ষেত্রে দেখা যায়, বেসামরিক নাগরিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সামরিক কর্মকাণ্ডকে সুরক্ষা দেওয়া হয়।’

ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের প্রসিকিউটর কার্যালয় একটি প্রাথমিক পরীক্ষা চালাচ্ছে বলে জানান ফাতু। তিনি বলেন, ‘আমার অফিস থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাওয়া হবে এবং যেকোনও ধরনের উসকানি কিংবা অবৈধ শক্তি প্রয়োগের ঘটনা রেকর্ড করা হবে।’

স্ত্রী আর দুই বছরের সন্তান রেখে নিহত হয়েছেন সাংবাদিক ইয়াসির মুর্তজা। ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক শাদি আল আসার মুর্তজার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা গার্ডিয়ানকে জানান। তিনি জানান, ইসরায়েলের সীমান্ত বেড়া থেকে কয়েকশো মিটার দূরে তার সঙ্গেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মুর্তজা। তবে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সিন্ডিকেট জানিয়েছে,ইসরায়েলের সীমান্ত বেড়া থেকে অন্তত ৩৫০ মিটার দূরে ছিলেন মুর্তজা। সেখান থেকেই আরও ভালো ছবি তোলার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনিদের পুরনো টায়ার পোড়ানোর ধোঁয়ার মধ্যে ঢুকে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর ছোড়া টিয়ারগ্যাস থেকে বাঁচতে এসব টায়ার জ্বালিয়েছিল ফিলিস্তিনিরা।

শাদি আল আসার বলেন,‘কিছুক্ষণ পর দেখলাম কয়েকজন তরুণ একজনকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে আসছে। তখন আমি ছবি তোলার জন্য এগিয়ে গেলাম আর দেখলাম এটা আমার বন্ধু মুর্তজা।’ তিনি এবং অন্যরা মিলে তার প্রেস লেখা জ্যাকটটি খুলে পেটের বাম পাশের ক্ষতস্থানটি দেখতে পান। আসর জানান, প্রথমে ভেবেছিলাম এটা ছোটখাট কোনও ক্ষত। গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় তার সঙ্গে ছিলেন অপর ফিলিস্তিনি সাংবাদিক রুশদি সিরাজ। তিনি টেলিগ্রাফ ইউকে’কে জানান মুর্তজা প্রেস জ্যাকেট আর হেলমেট পরিহিত ছিল। এই জ্যাকেট দূর থেকে ভালোভাবেই দেখা যায়। এটা পরিষ্কার যে তাকে তার কাজের জন্যেই গুলি করা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে করে মুর্তজাকে খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে নেওয়া হলে শনিবার ভোরেই মারা যান তিনি।

৩৫ বছরের আসার বলেন,ভালো মানুষ ছিলেন মুর্তজা,সবসময় হাসতেন,ভালোবাসতেন সবাইকে। কাজের প্রতি নিবেদিত মুর্তজা সবসময়ই ভালো শটটা পেতে চাইতেন। তার প্রজন্মের আরও অনেক গাজাবাসীর মতো জীবনে এই উপত্যকার বাইরে বের হবার সুযোগ পাননি মুর্তজা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য