বিচারকের বেঁধে দেওয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ করেননি দুর্নীতির অভিযোগে ১২ বছরের দণ্ড পাওয়া ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।

শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকাল ৫টার মধ্যে দক্ষিণের কুরিচিবা শহরের পুলিশ সদরদপ্তরে লুলাকে হাজির হতে বলেছিলেন ফেডারেল বিচারক সার্জিও মোরো। আত্মসমর্পণের পর তাকে কারাগারে পাঠানোরও প্রস্তুতি চলছিল।

বিচারকের নির্দেশ অমান্য করে ৭২ বছর বয়সী লুলা শুক্রবার বিকালেও সাও পাওলো শহরের বাইরে মেটাল ওয়ার্কারস ইউনিয়নের এক কার্যালয়ের ভেতর অবস্থান করছিলেন বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তার আইনজীবীরা তখনও আত্মসমর্পণ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে দেনদরবার করছিলেন।

স্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে শনিবার লুলা আত্মসমর্পণ করতে পারেন বলে ইঙ্গিত দেওয়া হলেও অনেকের ধারণা, সাবেক এ ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী সপ্তাহজুড়ে কার্যালয়ের ভেতরেই থাকবেন।

শুক্রবার সারাদিন ধরেই কার্যালয়টির বাইরে লুলার হাজারো সমর্থককে দেখা গেছে।

“ফেডারেল পুলিশ যদি তাকে গ্রেপ্তারে এখানে আসে, তাহলে ভেতরে ঢোকার জায়গাই পাবে না,” রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন ঘটনাস্থলে থাকা লুলা সমর্থক হুয়াও জাভিয়ের।

লুলা কোথায় আছেন তা জানা থাকায় তাকে ‘পলাতক’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষও।

বিচারকের বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হওয়ার আগে লুলার আইনজীবীরা তাকে জেলের বাইরে রাখার একটি আবেদন করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়।

মেটাল ওয়ার্কারস ইউনিয়নের ওই কার্যালয়েই শনিবার সকালে লুলার স্ত্রী মারিসা ল্যাটিসিয়ার স্মরণে ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের একটি জমায়েতেরও আয়োজন করা হয়েছে বলে টুইটারে জানিয়েছেন ব্রাজিলের সিনেটর গ্লেইসি হফম্যান।

এরপরই আত্মসমর্পণ বিষয়ে লুলা তার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘুষ গ্রহণের এক মামলায় সাবেক এ প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ১২ বছরের কারাদণ্ডাদেশ আছে; আপিল চলাকালীন সময়ে তিনি মুক্ত থাকতে চেয়েছিলেন।

লুলা শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ অ্যাখ্যা দিয়ে আসছেন।

চলতি বছরের অক্টোবরে হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরে রাখতেই এ চক্রান্ত চলছে বলেও অভিযোগ তার। জনমত জরিপগুলোতেও লুলাকেই নির্বাচনী দৌড়ে এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে বলে খবর বিবিসির।

২০০৩ থেকে ২০১১ পর্যন্ত টানা দু্ই মেয়াদে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন লুলা সিলভা। অর্ধ শতকের মধ্যে প্রথম এ বামপন্থি প্রেসিডেন্টের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে ম্ত্রে ৮ বছরের মধ্যেই দেশটির কয়েক কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।

সামাজিক কর্মসূচিতে বিস্তর খরচ করার কারণে তার মেয়াদকালীন সময়েই ব্রাজিল তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখেছিল।

২০১৪ সালে লুলার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়। ‘অপারেশন কার ওয়াশ’ নামে ওই তদন্তে ঘুষ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হিসেবে বিভিন্ন দলের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার নাম উঠে আসে। লুলার বিরুদ্ধে কোপাকাবানা সৈকতমুখী একটি অ্যাপার্টমেন্ট ঘুষ হিসেবে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যার বাজার মূল্য প্রায় ১১ লাখ ডলার।

অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে নয় বছরের কারাদণ্ড হয় সাবেক এ প্রেসিডেন্টের। রায়ের বিরুদ্ধে প্রথম আপিলেও হেরে যান তিনি।

জানুয়ারিতে দেওয়া আপিলের রায়ে লুলার সাজার মেয়াদ আরও বাড়িয়ে ১২ বছর করা হয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় আপিলে যান নিম্নবিত্ত ও শ্রমিকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় এ সাবেক প্রেসিডেন্ট।

লুলা বলছেন, সাজা ও কারাদণ্ডের মেয়াদের বিরুদ্ধে তার লড়াই হচ্ছে ব্রাজিলের সামরিক শাসনবিরোধী লড়াইয়েরই ধারাবাহিকতা। ১৯৮৫ সালে দেশটিতে সামরিক শাসনের অবসান হয়েছিল।

“আমি সামরিক একনায়কতন্ত্রকে মেনে নিইনি, কৌঁসুলিদের এ একনায়কতন্ত্রও মেনে নেব না,” সোমবার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন তিনি।

আত্মসমর্পণের পরই লুলার কারাভোগ শুরু হবে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক প্রেসিডেন্টের সাজা বিষয়ক আইনী প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক বিষয় দেখভালের জন্য আরও দুটি উচ্চতর আদালত আছে। সেসব আদালত থেকেও ছাড়পত্র পাওয়ার সুযোগ আছে টানা দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকা বামপন্থি এ রাজনীতিকের।

অক্টোবরের নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারবেন কিনা সে বিষয়েও দেশটির সুপিরিয়র ইলেকটোরাল আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। অগাস্টের আগে ওই সিদ্ধান্ত হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য