তারা স্বপ্ন দেখিয়েছিল প্রত্যন্ত এলাকায় ঝড়ে পড়া ছেলেমেয়েদের স্কুলমুখী করে শিক্ষাকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ঢাকঢোল পিটিয়ে দেড় শতাধিক স্কুলের জন্য ঘরভাড়া নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারীও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। ‘স্বপ্ন ফাউন্ডেশন স্কুল’ নামে প্রকল্পটি তিনমাস ধরে কার্যক্রম চালালেও নিয়োগকৃতরা এখনো পায়নি কোন বেতন-ভাতাদি।

ফলে মানবেতরভাবে জীবনকাটা এসব শিক্ষক কর্মচারী ফাঁস করে দিলেন ভিতরের অনেক গোপন কষ্টের কথা। জানালেন বিভিন্ন নিয়োগে চক্রটি হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় কোটি টাকা। ফলে এ যেন ‘স্বপ্ন প্রকল্পের নামে দু:স্বপ্নের যাত্রা শুরু করা কিছু মানুষের স্বপ্নভাঙার গল্প।

সরজমিনে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরীতে গিয়ে জানা যায় স্থানীয় বেসরকারি এনজিও ‘আশার আলো পল্লী উন্নয়ন সংস্থা’। নেদারল্যান্ড ভিত্তিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে পার্টনার এনজিও ‘স্বপ্ন ফাউন্ডেশন ও বুটিক হাউজ’ সরাসরি এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

মূলত: ঝড়ে পড়া শিশুদের নিয়ে স্কুল কার্যক্রম করছে তারা। এজন্য দেড় শতাধিক স্কুলে লোকজন নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আর এই নিয়োগে প্রতারক সংস্থাটির লোকজন হাতিয়ে নিয়েছে কোটি টাকা। ‘স্বপ্ন ফাউন্ডেশন স্কুল’ প্রকল্পের নামে তিন মাস ধরে স্কুল চললেও সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত শিক্ষার্থীরাসহ শিক্ষকগণ।

অভিযুক্তরা জানান, দেড় শতাধিক স্কুলে পাঁচজন করে শিক্ষক নিয়োগে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং একজন আয়া নিয়োগে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ নিয়েছে। অথচ উপজেলা প্রশাসন প্রকল্পের কিছুই জানেন না। বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ছিট মালিয়ানী স্বপ্ন ফাউন্ডেশন স্কুলে গিয়ে দেখা যায় ৩০জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাচ্ছেন একজন শিক্ষক। সাথে আছেন আরও চারজন শিক্ষক ও একজন আয়া।

শিক্ষকরা জানান, ১জানুয়ারি থেকে তারা পাঠদান শুরু করেছেন কিন্তু তিন মাসে পেরিয়ে গেলেও বেতন পাননি। পোশাক, দুপুরে খাবার ও দৈনিক ১৫ টাকা হারে বৃত্তির টাকা দেয়ার কথা থাকলেও তা পায়নি শিক্ষার্থীরা। শুধু নিম্নমানের একটি করে বই হয়েছে।

প্রধান শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, আশার আলোতে যোগাযোগ করে কিছু টাকা দিয়ে স্কুল শুরু করেছি। সহকারি শিক্ষক সুরাইয়া আক্তার সুমী বলেন, আমরা নিয়মিত ক্লাশ নিচ্ছি। আজও বেতন পাইনি। সহকারি শিক্ষকের স্বামী মিজান বলেন, টাকার মাধ্যমে নিয়োগ নিলেও তিন মাসেও বেতন পায়নি আমার স্ত্রী। এখন শুনতেছি প্রকল্পটি ভুয়া। স্থানীয় পরেশ চন্দ্র বলেন, এলাকায় ১০-১২টি স্কুল হয়েছে। প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকে ১৫ হাজার থেকে শুরু করে ৪০হাজার করে টাকা নিয়েছে বলে শুনেছি। মাসিক দুই হাজার টাকায় স্কুল ঘর ভাড়া নেয়া হলেও কেউ ভাড়া পায়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আশার আলো পল্লী উন্নয়ন সংস্থা ২০১৭সালের শুরুতে স্বপ্ন ফাউন্ডেশন শিশু শিক্ষা প্রকল্পের নাম করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রথম দফায় স্কুল প্রতি ৩০-৫০হাজার টাকা নিয়ে ২৩টি স্কুল অনুমোদন দেয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন এলাকায় তার লোকজনের মাধ্যমে জনপ্রতি ১০-৫০হাজার টাকা নিয়ে সরাসরি শিক্ষক ও আয়া নিয়োগ দেয় সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আজিজার রহমান মন্ডল।

পৌরসভার পায়ড়াডাঙ্গা বালাশীপাড়া স্বপ্ন ফাউন্ডেশন স্কুলের সহকারি শিক্ষক রওশনারা বেগম বলেন, বানুরখামার এলাকার খলিলুর রহমান ১০হাজার টাকা নিয়ে এখানে আমাকে চাকুরি দেয়। তবে নিয়োগপত্র দেয়নি। এমনি স্কুলে ক্লাস নিচ্ছি। ভুরুঙ্গামারীর রফিকুল নাকি খলিলের (বস)। স্কুলের সব শিক্ষকের কাছে টাকা নেয়া হয়েছে জানান তিনি। এ বিষয়ে কথা বলতে খলিলুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। পৌরসভার মাজারপাড়া আনন্দ স্কুলে দেখা মেলে প্রকল্প পরিদর্শক নবীবুর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলমের।

নবীবুর রহমান বলেন, আমার কাজ স্কুল দেখভাল করা। বেতনের বিষয় বলতে পারবোনা। জাহাঙ্গীর আলম পরিদর্শণ খাতায় স্বাক্ষর শেষে বলেন, স্কুলগুলো কয়েকবার অডিট হয়েছে; আর একবার অডিট হলে বিস্কুট ও বেতন দেয়ার কথা। একটি সূত্র জানায়, এক থেকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে উপজেলায় ৬ জন পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

পূর্বসূখাতী এলাকার আলমগীর হোসেন বলেন, অফিসে গিয়ে স্কুল চাই আমি। একজন বলল স্কুল শেষ। পরে অন্য একজন বলেন চারটি স্কুল ভাগে পাওয়া গেছে। দু’দিনের মধ্যে ১লাখ দিলে স্কুল দেয়া হবে।

শিক্ষকদের নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে ‘স্বপ্ন ফাউন্ডেশন এন্ড বুটিক হাউস’ নামক প্রতিষ্ঠানের প্যাডে। এতে ঠিকানা রয়েছে; হাউজ নং-৭৫, রোড নং-১৩, সেক্টর-১৯, উত্তরা ঢাকা। প্রধান শিক্ষক মাসিক ১৪ হাজার, সহকারি ১২ এবং আয়া আট হাজার বেতন উল্লেখ রয়েছে। জেলা সমন্বয়কারী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন আজিজার রহমান। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে সংস্থাটির পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল ব্যাপারী ও ভাইস-চেয়ারম্যান বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মোকছেদ আলী অনেকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়েছেন।

আশার আলো পল্লী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আজিজার রহমান মন্ডল জানান, ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীদের প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার জন্য এ প্রকল্প। নেদারল্যান্ডের দাতা সংস্থা অর্থায়ন করবে। তাদের সাথে চুক্তি করেছে স্বপ্ন ফাউন্ডেশন ও বুটিক হাউজ। আমরা তৃতীয় পক্ষ। তিনি দাবী করেন উপজেলায় তার ৪৮টি স্কুল রয়েছে। বাকিগুলো অন্যকেউ করতে পারে। টাকা লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করে আজিজার রহমান মন্ডল বলেন, আমি সরাসরি কারও কাছ থেকে টাকা নেইনি। আমার কাছ থেকে অনেকে স্কুল নিয়ে শিক্ষক নিয়োগে ৩০-৫০ হাজার করে টাকা নিয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসলেম উদ্দিন শাহ বলেন, এরকম কোন কার্যক্রমের চিঠি আমাদের হাতে আসেনি। দেশী-বিদেশী যারাই হোক না কেন শিক্ষা প্রকল্প হলে আমাদের জানার কথা।

এ ব্যাপারে নাগেশ^রী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শঙ্কর কুমার বিশ্বাস জানান, মাস তিনেক আগে কয়েকজন আমাকে বিষয়টি জানিয়েছিল। কয়েকদিন আগে আশার আলো সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আজিজার রহমান মন্ডলসহ তার লোকজনকে ডেকে কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। তারা প্রকল্পের কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেনি সময় নিয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য