উত্তাল সাগরে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার পথে থাকা ৫৬ জন রোহিঙ্গার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। সোমবার (২ এপ্রিল) জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মুখপাত্র ক্যারোলিন গ্লুক থাই-মালয়েশিয়া সীমান্তের পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় ভাসমান নৌকাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বিপদ সংকেত পাওয়ামাত্রই নৌকাটির আরোহীদের উদ্ধার করা হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে তাদের তীরে ভিড়তে দেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন গ্লুক।

মিয়ানমারে জাতিগত নিধনের শিকার রোহিঙ্গাদের বড় অংশটি বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও কারও কারও প্রচেষ্টা থাকে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পাড়ি দেওয়ার। রবিবার (১ এপ্রিল) থাই উপকূলে মালয়েশিয়াগামী এমনই এক রোহিঙ্গাবাহী নৌকা শনাক্ত হওয়ার খবর জানায় ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি। সংশ্লিষ্ট এক থাই কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে এএফপি জানায়, ক্রাবি প্রদেশের উপকূলে স্থানীয় গ্রামবাসী রোহিঙ্গাদের খাবার দিয়েছে এবং পরে নৌকাটি মালয়েশিয়ার দিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সোমবার (২ এপ্রিল) ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র ক্যারোলিন গ্লুক বলেন, গত সপ্তাহে নৌকাটি রাখাইন থেকে রওনা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তার ধারণা, ঝড়ো আবহাওয়ার মধ্যে শনিবার সন্ধ্যায় নৌকাটি থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ এলাকায় ভিড়ানো হয়। রয়টার্সের কাছে পাঠানো এক ই-মেইলে গ্লুক বলেন, ‘বর্তমানে নৌকাটি বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে থাই-মালয়েশীয়া সীমান্তবর্তী পশ্চিম উপকূলে ভাসমান আছে। নৌকায় থাকা শরণার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। যদি তাদের সংকটাপন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়, তবে আশা করি তাদেরকে উদ্ধার করা হবে এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নৌকাটি তীরে ভিড়ানোর অনুমতি দেওয়া হবে।’

২০১২ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার পর লাখো রোহিঙ্গাকে সাগরপথে বিভিন্ন দেশের উদ্দেশে পালাতে দেখা গেছে। অনেকে আবার তখন মানব পাচারকারীদের কবলেও পড়েছিলেন। ২০১৫ সালে সাগরপথে দলবদ্ধভাবে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বেড়ে যায়। সে সময় আন্দামান সাগর হয়ে ২৫ হাজার রোহিঙ্গা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিল। রবিবার মালয়েশিয়ার পথে রওনা হওয়া নৌকার প্রসঙ্গে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, তারা মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীরা পৌঁছানোর পর তাদেরকে যেকোনও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতি এবং গাদাগাদি অবস্থার কারণে অন্য রোহিঙ্গারা পালানোর জন্য ঝুঁকি উপেক্ষা করে এসব দেশকে বেছে নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, অতীতের মতো বিপুল সংখ্যায় না হলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে আবারও রোহিঙ্গাদের ঢল নামতে পারে।

তবে রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট একজন বিশেষজ্ঞ এই নতুন জনস্রোত সৃষ্টির আশঙ্কা মানতে নারাজ। একটি স্বাধীন গবেষণা ও পরামর্শক সংগঠন আরাকান প্রজেক্টের ক্রিস লিওয়া ওয়াশিংটন পোস্টকে ওই অঞ্চলের আবহাওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন, মাছ ধরার মৌসুম শেষ হওয়ায় বিশাল সংখ্যক নৌকায় করে মানুষের পলায়নের ঘটনা ঘটবে না। অন্তত বর্ষাকাল শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তা হবে না। একইসঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষও অনুমোদনহীনভাবে কোনও নৌকা ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুবই সতর্ক রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।

মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন ইতোমধ্যে ‘জাতিগত নির্মূলের পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব প্রশ্ন তুলেছেন, দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হলে তাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ ছাড়া আর কী নামে ডাকা হবে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণকে রোহিঙ্গা তাড়ানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও এনেছে জাতিসংঘ।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য