সুবল রায়, বিরল (দিনাজপুর) থেকেঃ দিনাজপুরের বিরলে জমির দখল ধরে রাখতে সৃষ্ট সংঘর্ষে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিপক্ষের দাবী বিবাদীয় জমি থেকে ঘর-বাড়ী উচ্ছেদ করতে যে পক্ষটি ভাড়াটিয়া বাহিনী দিয়ে তান্ডব চালিয়েছে উল্টো তারাই আবার নিজেদের লোককে মেরে ফেলে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য ফন্দি এটেছে।

তাই নিজের রোপনকৃত জমিতে ধান ক্ষেত ধরে রাখতে পারলেও নিজের জীবন প্রদীপ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন জুয়েল ওরফে সোহেল। জমি দখলকে কেন্দ্র করে গত ২৪ মার্চ শনিবার মাগরিবের নামাজের পর সৃষ্ট সংঘর্ষে গুরুত্বর আহত অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫ মার্চ রবিবার রাত ৯টায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে নিজের জীবন প্রদীপ নিভে যায় জুয়েল ওরফে সোহেল (৪৭) এর। নিহত সোহেল উপজেলার রাণীপুকুর ইউপি’র হালজায় (শালতলা) গ্রামের মৃত আখিম উদ্দীনের পুত্র। নিহতের পুত্র মাসুদ রানা (২৮) বাদি হয়ে প্রতিপক্ষ মমিনুল ইসলাম (৪৫) সহ ২০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে ২৬ মার্চ সোমবার বিরল থানায় একটি ২২ নং হত্যা মামলা দায়ের করে। পুলিশ এজাহার নামীয় ১ জন মহিলাসহ ৫ জনকে আটক করে আদালতে সোপর্দ করলে বিজ্ঞ বিচারক তাঁদের ৪ জনকে জেল হাজতে পাঠায়।

আটককৃতদের মধ্যে প্রতিপক্ষ মমিনুল ইসলাম নিজের ঘর-বাড়ী বাঁচাতে গিয়ে ঘটনার দিন সৃষ্ট সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। মামলা রেকর্ড হওয়ার পরদিন ২৭ মার্চ মঙ্গলবার পুলিশ অসূস্থ্য চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁকে জেল হাজতে পাঠায়।

এলাকাবাসী থানার এজাহার ও দলিল সুত্রে জানা গেছে, উপজেলার রাণীপুকুর ইউপি’র হালজায় (শালতলা) গ্রামের মৃত আখিম উদ্দীনের পুত্র জুয়েল ওরফে সোহেল (৪৭) হালজায় মৌজায় ২৪৯/২০০০ নং দলিল মূলে ২৪৯২ দাগে ৪৩ শতক জমি নিয়ে বিবাদ চলছিল। এর পার্শ্ববর্তী ২৫২০ নং দাগে ৩৭ শতক ৮৫৫২/২০১৬ নং দলিল মূলে আমিনুল ইসলাম ডিলার (৪৮) এর স্ত্রী শাহনাজ বেগম এর আম ও লিচু বাগানে প্রতিপক্ষ মোমিনুল ইসলাম ঘর-বাড়ী নির্মাণ করে বসবাস শুরু করলে থানায় অভিযোগ দায়ের করে শাহনাজ বেগম।

থানায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ দফায় দফায় শালিস মিমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হলে শাহনাজ বেগম এর ভাই বিরলে চৌধূরী স্টেট এর অনেক জমির বিবাদ সৃষ্টিকারী ভূমিদস্যু রামপুর দক্ষিনপাড়া গ্রামের মৃত নেজাম উদ্দীনের পুত্র নূর মোহাম্মদ অরফে নুরু নিজস্ব ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী দিয়ে মোমিনুলের ঘর-বাড়ী উচ্ছেদ করতে যায় এবং ঘর-বাড়ী ভাংচুর, লুটপাট করে মমিনুলের বৃদ্ধ পিতা মকবুল হোসেন (৭০) ও বৃদ্ধা মাতা নছিমন বেগম (৬০) কে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

এ সময় মোমিনুল ও তাঁর পরিবারের লোকজন নিজেদের জীবন ও ঘর-বাড়ী বাঁচাতে গেলে তাদেরকে মারপিট করে গুরুতর আহত করা হয়। মোমিনুলরা চিকিৎসা নিতে গেলে জমির ওয়ারিশ হওয়ার সাধ মিটিয়ে দেয়ার হীন মনমানসিকতায় নূর মোহাম্মদ ও তাঁর ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী বাহিনী নিজেরা বাঁচতে রাতের আধাঁরে জুয়েল ওরফে সোহেল এর মাথায় আঘাত করে মিথ্যা ও বিভ্রান্তকর তথ্য ছড়িয়ে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে মোমিনুলকে দেখে শাহনাজ বেগমের লোকজন বিচলিত হয়ে সেখানে তাঁর চিকিৎসা না করেই রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলে সুচিকিৎসার অভাবে নূর মোহাম্মদ ও তাঁর ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতেই জুয়েল ওরফে সোহেল এর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

এদিকে, চিকিৎসাধীন প্রতিপক্ষ মোমিনুলকে ফাঁসাতে নূর মোহাম্মদ গংরা জমি রক্ষার্থে প্রকৃত ওয়ারিশদের শায়েস্তা করতে যে জমি নিয়ে সেদিন কোন বিরোধ বা সংঘর্ষ বাঁধেনি সেই জমির ভোগদখলকারী জুয়েল ওরফে সোহেল এর পুত্র মাসুদ রানাকে বাদী করে মনগড়া কাহিনী সাজিয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।

শুধু মামলা দায়ের করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের আসামী করে পুলিশ দিয়ে তাঁদের আটক করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠায়। তাই এ ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানিয়েছে সচেতন মহল। ঘটনার সঠিক তদন্ত হলে নিরপরাধ মোমিনুল ইসলামসহ নিরীহ মানুষগুলো ভূমিদস্যু নূর মোহাম্মদ এর কুচক্রান্তের হীন কৌশলে তীব্র ভোগান্তি থেকে রেহাই ও মূল হত্যাকবারীদের বিচারের আওতায় নেয়া সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।

শাহনাজ বেগম এর স্বামী আমিনুল ইসলাম জানান, সেদিনের সংঘর্ষে আম ও লিচু গাছসহ মোট ৩২ টি, ১টি স্যালো মেশিন, বোরিং এর পাইপ ভাংচুর করা হয়েছে। আর কেউ আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আহত আর কেউ হয়েছে কি না জানেন না বলে জানান। জমি নিয়ে পূর্ব বিরোধে থানায় অভিযোগ এবং শালিসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ ব্যপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হোননি।

প্রতিপক্ষের দাবী যে জমিতে ঘর-বাড়ী উচ্ছেদ করা হলো সে জমির বিবাদীদের কেউ আহত না হলেও অন্য জমির বিবাদী নিহত হয় কিভাবে? আমাদের ঘর-বাড়ীতে লুটুপাট চালানো হলো, আমাদেরকে নির্মমভাবে মারপিট করা হলো, আবার আমরাই হত্যা মামলার আসামী? প্রতিপক্ষরা ন্যায় বিচারের দাবী জানিয়েছেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জগৎপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মাহমুদুল হাসান জানান, তদন্ত চলছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী রিমান্ড আবেদনসহ পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য