পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর কেশারি নাথ ত্রিপাঠি শনিবার সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাপূর্ণ এলাকা আসানসোল ও রানিগঞ্জ পরিদর্শন করেছেন। এসময় তিনি ভুক্তভোগী ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সাড়ে চার ঘন্টার এই সফরে তিনি কোনও মুসলিম এলাকায় যায়নি। মুসলিম এলাকায় না যাওয়া প্রসঙ্গে পরিদর্শন শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে কোনও জবাব দেননি গভর্নর। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য, গভর্নর যেতে চাননি। যদি চাইতেন তাহলে সেখানে নিয়ে যাওয়া কঠিন হতো। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এখবর জানিয়েছে।

গত রবিবার হিন্দু দেবতা রামের জন্ম বার্ষিকী উদযাপনের রাম নবমীর র‌্যালি থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এখন পর্যন্ত সহিংসতায় চারজন নিহত হয়েছে। সহিংসতাপ্রবণ রানীগঞ্জ ও পুরুলিয়া এলাকায় বেশ কিছু বাড়িঘর ও একটি মসজিদের পাশে দোকানপাটে হামলা চালানো হয়েছে। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা। ওই এলাকায় গনজমায়েত নিষিদ্ধ করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট সেবা। সহিসংতার শুরু হওয়ার একদিন পর উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় ত্রিপাঠির সফরে বাধা দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। পরে শনিবার তিনি সেখানে পরিদর্শনে যান।

আসানসোল সার্কিট হাউসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর জানান, তিনি আইজিপি, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। তাকে যা জানানো হয়েছে তাতে তিনি সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, আমি শান্তির বার্তা নিয়ে এখানে এসেছি। আমি সবাইকে সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং একে অপরকে শ্রদ্ধা করার আহ্বান জানাচ্ছি। সবার উচিত অন্যের ধর্মীয় উৎসবের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।

মুসলিম অধ্যুষিত ছেলিডাঙ্গা এলাকার স্কুলশিক্ষক তারিক আনওয়ার সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, আমরা শুনেছি গভর্নর আসছেন। আমরা আশা করেছিলাম তিনি আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তিনি সরকারের প্রধান, কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নন। তিনি এতো কাছে এসেও আমাদের এলাকায় আসেননি। অন্তত পক্ষে তার উচিত ছিল ছেলে হারানো ইমামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা।

ত্রিপাঠি আসানসোলের যে এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছেন সেই স্থানের কাছেই ইমাম রশিদির ছেলে সিবতুল্লাহ নিহত হয়েছেন।

ছেলিডাঙ্গার ১৬ বছরের নাদিম রেজা বলেন, আমি ও বন্ধুরা তাকে বলতে চেয়েছিলাম যে, পরিস্থিতির কারণে আমরা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে পারিনি। তিনি আমাদের পুনরায় পরীক্ষার যদি কিছু করতে পারেন। আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছিলাম। এখানকার অন্তত ২০ জন পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি।

সহিংসতাপূর্ণ এলাকার ২৫ নং ওয়ার্ডের স্থানীয় কাউন্সিলর ও তৃণমূল কংগ্রেস নেতা মো. নাসিম আনসারি বলেন, আমরা জানি না কেন আমাদের সম্মানীত গভর্নর সংখ্যালঘুদের কোনও এলাকায় যাননি। আমরা আশা করছিলাম তিনি আসবেন এবং আমাদের কথা শুনবেন।

পরিদর্শনের সময় গভর্নর প্রথমে আসানসোলের কল্যাণপুর হাউজিং এলাকায় যান। কিন্তু সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষেরা দুইদিন আগেই নিজ বাড়ি চলে গেছেন। তিনি শুধু পথচারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপর তিনি চাঁনমারিতে যান। যদিও এটা তার সূচিতে ছিল না। এলাকাটিতে সহিংসতা বড় আকার ধারণ করেছিল। সেখানে তিনি কিছু ভেঙে পড়া দোকান দেখেন।

যেসব মানুষ ত্রিপাঠির কাছে অভিযোগ তুলে ধরেন তারা অভিযোগ করেন পুলিশ গভর্নরের কাছ থেকে তাদের দূরে রেখেছে। নাম প্রকাশ করতে রাজি না হওয়া এক ব্যক্তি সহিংসতার ব্যাপ্তি চেপে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, সকাল থেকেই পুলিশ সড়ক পরিচ্ছন্ন করা শুরু করে। তারা আমাদের কয়েকজনকে বাড়ি ও দোকান খোলা রাখতে বলে। পুড়ে যাওয়া গাড়িতে কালো প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে রাখতে বলা হয়।

১৯ মার্চ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের কাছ ঘটনার রিপোর্ট জানতে চায়। রিপোর্ট পাওয়ার পর কেন্দ্র আধা-সামরিক বাহিনী পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাতে রাজি হয়নি।

সহিংসতার এক ভূক্তভোগী গিতা দেবি চিৎকার করে গভর্নরকে বলেন তার দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের বাড়ি লুট করা হয়েছে, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা রাস্তায় বাস করছি।

গভর্নরের গাড়ি বহর এরপর চক এলাকায় যায়। চানমারি থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্ব। এখানে ত্রিপাঠি কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু কাছেই থাকা মুসলিম এলাকা ছেলিডাঙ্গা, রেল পার, ওক রোড, ডিসি রায় রোডে যাননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মুসলিম এলাকার গলিগুলো খুব সরু। যা দিয়ে গভর্নরের গাড়ির বহর চলাচল করা কঠিন। সঙ্গে রয়েছে নিরাপত্তা ও সংবাদমাধ্যমকর্মীরা। কে নেবে ঝুঁকি? এলাকাটি নিরাপদ নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গভর্নর ওই এলাকায় যাওয়ার কথা কখনও বলেননি। তিনি যদি চাইতেন তাহলে সেখানে নিয়ে যাওয়া আমাদের জন্য কঠিন হতো। সফরসূচিতে এলাকাটি ছিল না। আমরা তাকে দেখিয়েছি যেখানে সহিংসতা শুরু হয়েছে এবং গ্রেফতার ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছি।

আসানসোল পরিদর্শন শেষে ত্রিপাঠি রানিগঞ্জের একটি চায়ের দোকানে যান। এখানেও ২৬ মার্চ সহিংসতা শুরু হয়েছিল। গভর্নরের সঙ্গে কথা বলতে পারা বিশ্বনাথ সরফ বলেন, আমার বয়স ৮৪ বছর। এমন দাঙ্গা কখনো দেখিনি আমি। এমনটা হওয়া উচিত হয়নি।

রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি জানান, সহিংসতা কবলিত এলাকা সফরে তাদের কোনও বাধা ছিল না। কিন্তু তিনি প্রশ্ন তোলেন কেন গভর্নর নির্ধারিত এলাকা সফর করেছেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, তিনি যে পদধারী তা সাংবিধানিক। তার নিরপেক্ষতা নিয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলতে পারে।

বিজেপির রাজ্য সরকার শায়ন্তন বসু জানান, এ বিষয়ে কথা বলার অধিকার তৃণমূল সরকারের নেই। এর আগে তারা গভর্নর ও নির্বাচিত এমপিকে সেখানে যেতে দেয়নি। তিনি বলেন, তারা এটা শ্রদ্ধায় করেনি। ৩৫৬ ধারার কারণে তারা এই অনুমতি দিয়েছে। রাজ্যটির আইনশৃঙ্খলা একেবারে ভেঙে পড়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য