যুক্তরাজ্যে সাবেক রুশ গুপ্তচর হত্যাচেষ্টার জেরে বিশ্বজুড়ে রাশিয়ার কূটনীতিক বহিষ্কারের হিড়িক পড়ে গেছে। একযোগে বিপুল সংখ্যক রুশ কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ এর নেটো ও ইউরোপীয় মিত্রদেশগুলো।

সোমবার রাশিয়ার ৬০ কূটনীতিককে বহিষ্কারের আদেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একইসঙ্গে সিয়াটলে বন্ধ করা হয়েছে রাশিয়ার কনস্যুলেটও।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি নমনীয় মনোভাবের জন্য সমালোচিত ট্রাম্প এই প্রথম ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিলেন। তাছাড়া, ইতিহাসেও একসঙ্গে এত বেশি রুশ কূটনীতিক বহিস্কারের নজির নেই।

ট্রাম্পের বহিষ্কারাদেশ প্রাপ্তদের ৪৮ জন ওয়াশিংটনে রাশিয়ার দূতাবাসের গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং ১২ জন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ কার্যালয়ে রুশ মিশনে কর্মরত বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

“যুক্তরাজ্যের মাটিতে রাশিয়ার প্রাণঘাতী রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার এবং বিশ্বব্যাপী রাশিয়ার চলমান অস্থিতিশীল কর্মকান্ডের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র এর নেটো ও অন্যান্য মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে মিলে সমন্বিতভাবে এ পদক্ষেপ নিয়েছে” বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ স্যান্ডার্স।

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জার্মানি, ফ্রান্স, ইউক্রেইন, কানাডা এবং ইউরোপের আরো নানা দেশসহ মোট ২০ টি দেশ মিলে সোমবার রুশ কূটনীতিক বহিষ্কারের সংখ্যা ১শ’ ছাড়িয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “রাশিয়া গত ৪ মার্চ সামরিক-গ্রেডের একটি নার্ভ এজেন্ট ব্যবহার করে সলসবেরিতে এক নাগরিক ও তার মেয়েকে হত্যার চেষ্টা করে।”

“আমাদের মিত্র দেশ যুক্তরাজ্যে এ ধরনের হামলা চালিয়ে দেশটির অগণিত নিরপরাধ মানুষের জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ওই হামলায় তিন জন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, যাদের মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তাও আছেন।”

এ হামলা করে রাশিয়া ‘রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনের ভয়াবহ লঙ্ঘনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছে’ বলে বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়।।

ট্রাম্প প্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “রাশিয়া সরকারকে আমরা বলতে চাই; যখন আপনি আমাদের মিত্রদের আক্রমণ করবেন, তখন আপনাকেও গুরুতর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।”

রাশিয়া এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র দেশগুলোর এ ‘উস্কানিমূলক’ পদক্ষেপের পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

এর আগে যুক্তরাজ্য ২৩ রুশ কূটনীতিককে বরখাস্ত করে। জবাবে রাশিয়াও ২৩ ব্রিটিশ কূটনীতিককে বরখাস্তের আদেশ দেয়।

গত ৪ মার্চ ইংল্যান্ডে সলসবেরির উইল্টশায়ারে একটি পার্কের বেঞ্চ থেকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পক্ষত্যাগী সাবেক রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপাল (৬৬) ও তার মেয়ে ইউলিয়াকে (৩৩) উদ্ধার করা হয়।

পরীক্ষায় তাদের নোভিচক গ্রুপের একটি নার্ভ এজেন্ট দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।

৭০ ও ৮০’র দশকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এ সিরিজের নার্ভ এজেন্টগুলো তৈরি করেছে। যেগুলো সবচেয়ে মারাত্মক নার্ভ এজেন্ট (উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক) হিসাবে বিবেচিত।

যুক্তরাজ্যের অভিযোগ, রাশিয়া সরকারের নির্দেশেই স্ক্রিপাল ও তার মেয়েকে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ওই সময় যুক্তরাজ্যের পক্ষে নিজেদের সমর্থনের কথা জানায়। পরে ইইউও যুক্তরাজ্যের পাশে দাঁড়ায়।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে তার দেশে নার্ভ এজেন্ট ব্যবহারের ‘ধৃষ্টতা দেখানোর’ ব্যাখ্যা দিতে রাশিয়াকে গত ১৩ মার্চ মধ্যরাত পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন।

ওই সময়ের মধ্যে জবাব না দিয়ে রাশিয়া উল্টো যুক্তরাজ্যের দিকেই অভিযোগের আঙুল তোলে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ঘটনা এটিই প্রথম।

গত শুক্রবার ইইউ সদস্য দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে একমত হয়।

সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের রুশ কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘোষণার পরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ১৫ টি সদস্য দেশ রাশিয়ার কূটনীতিক বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে।

যেসব দেশ রুশ কূটনীতিক বহিষ্কার করেছে:

  • যুক্তরাষ্ট্র: ৬০ জন
  • কানাডা: ৪ জন
  • ইউক্রেইন: ১৩ জন
  • পোল্যান্ড: ৪ জন
  • ফ্রান্স: ৪ জন
  • জার্মানি: ৪ জন
  • চেক প্রজাতন্ত্র: ৪ জন
  • লিথুনিয়া: ৩ জন
  • ইতালি: ২ জন
  • ডেনমার্ক: ২ জন
  • নেদ্যারল্যান্ডস: ২ জন
  • এস্তোনিয়া: ১ জন
  • লাটভিয়া: ১ জন
  • ক্রোয়েশিয়া: ১ জন
  • ফিনল্যান্ড: ১ জন
  • রোমানিয়া: ১ জন
  • সুইডেন: ১ জন
  • স্পেন: ২ জন
  • আলবেনিয়া: ২ জন
  • নরওয়ে: ১ জন

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য