শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের সমর্থনে পুলিশের বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা এবং রাজনীতিবিদরা ক্যান্ডির মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, কর্মকর্তাদের ভাষ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

প্রতিবেদনে দাঙ্গা চলাকালীন সময়ে সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল বলে ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। পুলিশ এবং স্থানীয় বৌদ্ধ রাজনীতিবিদদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে এ ধারণা করেছে রয়টার্স।

এসব কারণে এ দাঙ্গাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ও উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী প্রচারণার মাধ্যমে গড়ে তোলা স্বতস্ফূর্ত দাঙ্গার চেয়ে বেশি কিছু ছিল বলে মন্তব্য বার্তা সংস্থাটির।

বৈচিত্র ও সহিষ্ণুতার জন্য পরিচিত শ্রীলঙ্কার পার্বত্য জেলা ক্যান্ডিতে তিনদিন ধরে চলা এ দাঙ্গায় উত্তেজিত বৌদ্ধ জনতা বেশ কয়েকটি মসজিদে অগ্নিসংযোগ করে; মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্তদের ঘরে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব চালায়।

অস্থিতিরতা মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা জারি করে লঙ্কান সরকার, এক সপ্তাহ বন্ধ রাখা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

রাজাপাকসে মুসলিমবিরোধী হামলায় নিজের ও দলের নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পুলিশ বলছে, দাঙ্গায় বাহিনীর সদস্য ও রাজনীতিবিদদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে।

নির্যাতিত ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশের একটি আধাসামরিক ইউনিট, দ্য স্পেশাল টাস্কফোর্সের (এসটিএফ) সদস্যরা মুসলিম আলেম ও ধর্মীয় নেতাদের ওপর হামলা চালায়। রয়টার্সের দেখা সিসিটিভি ফুটেজেও এ বক্তব্যের সত্যতা মিলেছে।

ক্যান্ডির স্থানীয় এসটিএফ কমান্ডার এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

“তারা হামলা করতেই এসেছিল। চিৎকার চেচামেচি করছিল, ছিল নোংরা কথাবার্তাও। তারা বলছিল- সব সমস্যার কারণ আমরা, আমরা নাকি সন্ত্রাসীদের মতো,” বলেন দাঙ্গায় আক্রান্ত এক মসজিদের আলেম এ এইচ রমিজ।

উন্মত্ত জনতার হাত থেকে যারা রক্ষা করবে, সেই পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ করেন সেদিন মসজিদটিতে নামাজ পড়তে আসা অনেকেও।

পুলিশের এক মুখপাত্র রুয়ান গুনাসেকারা ‘ঘটনার সময়ে পুলিশ সদস্যদের ঘাটতি অনুসন্ধানে’ বিশেষ একটি তদন্তদলকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানান।

দ্বিতীয় আরেকটি ইউনিট ঘটনায় রাজনৈতিক কর্মীদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সাম্প্রতিক এ দাঙ্গাকে শ্রীলঙ্কায় মুসলিমবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি ও উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের বৃদ্ধির নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চলতি মাসের দাঙ্গা ক্ষমতাসীন বহুজাতিক জোট সরকারকেও বিচলিত করে তোলে বলে বিশ্লেষক এবং লঙ্কান সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত দুটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স।

২০১৫ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই জোট সরকারই রাজপাকসেকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।

দুই কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার দেশটির ৭০ শতাংশই বৌদ্ধ। ১৩ শতাংশ তামিল জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই হিন্দু। মুসলমানরা মোট জনসংখ্যার মাত্র ৯ শতাংশ।

শ্রীলঙ্কার আইনশৃঙ্খলা মন্ত্রী রঞ্জিত মাদ্দুমা বান্দারা মার্চ মাসের মুসলিমবিরোধী সহিংসতাকে ‘সুপরিকল্পিত’ অ্যাখ্যা দিয়ে এজন্য সম্প্রতি অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে বিপুল ভোটে জয়ী রাজাপাকসে সমর্থিত পদুজানা পেরামুনা (এসএলপিপি) পার্টির সদস্যদের দায়ী করেছেন।

দাঙ্গাপরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে তার ও দলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ অ্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

‘অযোগ্যতা ঢাকতে’ এবং ‘মুসলিম ভোট টানতে’ সরকারই সহিংসতা উসকে দিয়েছে বলেও পাল্টা অভিযোগ করেছিলেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য