ফেসবুক কর্তৃক গ্রাহকের তথ্য হাতিয়ে নিয়ে তার অপব্যবহারের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে গ্রাহকের তথ্য ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণার কৌশল নির্ধারণের কাজে লাগানোর ঘটনায় ভুল স্বীকার করেছেন তিনি।

মার্ক জাকারবার্গ বলেন, গ্রাহকদের তথ্যের সুরক্ষা দিতে না পারলে তাদের সেবা দেওয়ার কোনও অধিকার আমাদের নেই। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এখানকার সবকিছুর জন্য দিনশেষে আমিই দায়বদ্ধ।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাকারবার্গ বলেন, ওই ঘটনার জন্য তিনি ‘আসলেই দুঃখিত’। এ সময় তিনি ‘দুর্বৃত্ত অ্যাপসগুলোর’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।

মার্ক জাকারবার্গের উল্লিখিত ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ফেসবুক তার সব অ্যাপ পরীক্ষা করবে, যাদের প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার রয়েছে।
  • সন্দেহজনক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত যেকোনও অ্যাপের ‘পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট’ করা হবে।
  • কোনও ডেভেলপার পুঙ্খানুপুঙ্খ অডিট করতে সম্মত না হলে তাদের ব্যান করা হবে।
  • ব্যক্তিগতভাবে শনাক্তযোগ্য তথ্যের অপব্যবহারকারী অ্যাপগুলো ব্যান করে দেওয়া হবে।
  • গ্রাহকের তথ্যের অপব্যবহার রোধে ভবিষ্যতে ডেভেলপারদের ডেটা অ্যাকসেস আরও সীমাবদ্ধ করা হবে।
  • কোনও গ্রাহক যদি তিন মাসের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনও অ্যাপ ব্যবহার না করেন তাহলে সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার ওই গ্রাহকের তথ্যে অ্যাকসেস পাবেন না।

২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে করা সব জরিপ মিথ্যা প্রমাণ করে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রায় পাঁচ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য হাতিয়ে নিয়ে তার এমন জয়ে ভূমিকা রাখে একটি ফেসবুক অ্যাপ। অ্যাপটির নাম ‘দিসইজমাইডিজিটাললাইফ’। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক আলেক্সান্ডার কোগান এটি তৈরি করেছিলেন। নির্বাচন নিয়ে গবেষণা করা ব্রিটিশ সংস্থা ‘কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা’র হয়ে অ্যাপটি ডেভেলপ করেছিলেন কোগান। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টরা প্রচারণায় সহায়তা পেতে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

সেই সময় ট্রাম্প ক্যাম্পেইনের পরামর্শক হিসেবে কাজ করা স্টিভ ব্যাননসহ কয়েকজন রিপাবলিকান সমর্থক কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দিসইজমাইডিজিটাললাইফ অ্যাপটি ২০১৫ সালে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ওপর একটি জরিপ চালায়। ফেসবুকের এই অ্যাপ ছিল মূলত একটি কুইজ। এর মাধ্যমে কুইজে অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিত্বের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা। প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী ওই কুইজে অংশ নেন। অর্থাৎ কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা এই অ্যাপের মাধ্যমে তিন লাখ ২০ হাজার জনের বিস্তারিত তথ্য পেয়েছিল। শুধু তাই নয়, ফেসবুকের সেই সময়কার নীতি অনুযায়ী, অ্যাপটির মাধ্যমে ওই তিন লাখ ২০ হাজার জনের বন্ধুদের বিস্তারিত তথ্যও কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার হাতে চলে যায়। সব মিলিয়ে পাঁচ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য পায় গবেষণা সংস্থাটি। পরে এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয়। যে ভোটারের ব্যক্তিত্ব যেমন তাকে লক্ষ্য করে ঠিক তেমন বার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।

অ্যাপের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা শিবির এত বেশি সংখ্যক ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য হাতে পেয়েছিল, যা ইতোপূর্বে কেউ পায়নি। অ্যাপের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাজানো কৌশলের কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েছেন বলে মনে করছেন অনেকে।
কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার বিষয়টি সামনে আসায় ফেসবুকের শেয়ারমূল্যের ব্যাপক দরপতন হয়েছে। ফেসবুক নিজেও এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। বিষয়টি নিয়ে ফেসবুক কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হওয়ার কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও তাজানি এক টুইটে লিখেছেন, ‘৫০০ মিলিয়ন ইউরোপীয় নাগরিকের প্রতিনিধিদের সামনে ফেসবুককে এই ব্যাখ্যা দিতে হবে, গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে না।’ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে অবশ্য এরইমধ্যে ফেসবুকের বক্তব্য জানতে চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় কমিটি জানিয়েছে, তারাও অভিযোগের জবাব পেতে জাকারবার্গকে কংগ্রেসে ডাকবেন। ঘটনার তদন্তও অব্যাহত থাকবে।

২০ মার্চ ২০১৮ মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় কমিটির ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ডিয়ানি ফেইনস্টেইন বলেছেন, গ্রাহকদের তথ্য বিষয়ে ফেসবুকের ধারণা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে কংগ্রেসে উপস্থিত হতে হবে। সূত্র: বিবিসি, ডয়চে ভেলে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য