মোঃ লিহাজ উদ্দীন মানিক, বোদা (পঞ্চগড়) থেকেঃ পঞ্চগড়ের বোদায় ৫ জন নারী জয়ীতা পুরস্কার পেয়েছে। সফল জননী নারী মোছাঃ মনছুরা আক্তার বানু, শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অজনকারী নারী দিপালী রানী, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী জীতা রানী, নির্যাতনের বিভিশিক্ষা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করেন যে নারী মোছাঃ রুপনা বেগম, অর্থনেতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী মোছাঃ শান্তনা আক্তার। এদের সফলতার জীবনের গল্প ও জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরা হলোঃ

সফল জননী নারী মোছাঃ মনছুরা আক্তার বানু, স্বামী আহমদ আলী, গ্রামঃ প্রামানিক পাড়া, তিনি বলেন আমার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভুগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিষয়ে অনার্সসহ পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিষয়ে মাষ্টার্সে সফলতার সাথে ১ম শ্রেণীতে ১ম স্থান অর্জন করে। আমার ২য় মেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছে। সে ১ম, ২য়, ৩য় বর্ষে ফাস্ট ক্লাস পেয়েছে।

আমার ছোট মেয়ে এ বছর এইচএসসি পাশ করেছে। সে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ভর্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও আমার বড় ছেলে ৩৭ তম বিসিএস এর লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শত কষ্টে উপেক্ষা করে আমার সন্তানদের মানুষ করে চলেছি। স্বপ¦ দেখি তারা একদিন মানুষের মত মানুষ হবে। আমার স্বামীর স্বপ্ন ও সীমিত আয়ের মধ্যে এভাবেই সন্তানদের মানুষ করার জন্য স্বপ্নের জাল বুনেছি।

শিক্ষা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে সাফল্য অজনকারী নারী দিপালী রানী, পিতাঃ নব কুমার রায়, মাতা সুমতি রানী, গ্রামঃ কালিয়াগঞ্জ, তিনি বলেন, আমাকে মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হয়েছিল। এ আমি হাঁস মরগি পালন ও হাতের কাজ করে লেখাপড়ার খরচ বহন করতে হয়েছিল। পরিবারের কাজ থেকে যখন যেটা প্রয়োজন তখন সেটা আমি পাইনি। তবুও আমি আমার লেখাপড়া চালিয়ে যাই। ২০০৮ সালে আমি এইচএসসি পরীক্ষা দেই। এইচএসসি পাশ করে আমি গ্রামের ছেলে মেয়েদের টিউশনি পড়াতে শুরু করি। এভাবে চলার মতো কিছু টাকা পাই। এরপর আমাদের গ্রামে একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুল খোলা হয় সেখানে আমি চাকুরী করি। অনেকদিন স্কুল চালিয়েছিলাম।

সেখানে চাকুরি করেও আমি অর্থ উপার্জন করেছিলাম। এর পর আমার মা শারীরিক ভাবে ভীষন অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। আমার মায়ের সেবা যন্ত্র করতে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। কেননা আমার মায়ের সেবা যন্ত্র করতে কেউ এগিয়ে আসেনি। আমার মায়ের এই মুমুষ সময়ে এক মাত্র আমিই যে তার সেবার কাজে ব্যস্থ ছিল। আমি ২০০৯ সালে বিএ কোর্সে ভর্তি হই। ২০১১ সালে আমি বিএ পাশ করি। তখন আমি আমার নাগরিকত্ব নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। আমাদের বাড়ি ছিল কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নের নাজিরগঞ্জ ৪১ নং ছিটমহলে। আমাদের ইউনিয়ন ফেডারেশনে ভোট তুলার জন্য কিছু লোক আসে। আমি আমার বাবা মাকে নিয়ে ভোট তুলার জন্য সেখানে যাই। কিন্তু আমাদের কালিয়াগঞ্জের মানুষ এস নিষ্টুর যে তারা আমার ভোট তুলতে পারবে না বলে জানিয়ে দিল।

তবুও আমি ভোট না তুলে বাড়িতে আসলাম না। আমার মা বাবা এবং আমি সেখানে কার একটি বাড়িতে গিয়ে থাকলাম এবং আমি আমার মা-বাবা মানুষদের অনুরোধ জানিয়ে আমি আমার ভোটাধিকার লাভ করেছিলাম। এর পর আমি এমএ তে ভর্তি হই। এম এ পাশ করে আমি এভাবে আরও কিছুদিন বেকার থাকি। তারপর আমাদের কালিয়াগঞ্জ ব্র্যাক শিক্ষা অফিস থেকে জানতে পারি যে যেখানে কিছু সংখ্যক শিক্ষিকা নিয়োগ করা হবে। আমি সেখানে চাকুরি করার জন্য আবেদন করি। এবং পরীক্ষা দেই। আমি বর্তমানে ব্র্যাকে শিক্ষিকা পদে চাকুরি করছি। তাই আমার জীবনে কিছুটা সুখের হাওয়া বইছে বলে আমি মনে করি।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী জীতা রানী, স্বামী সর্বচাঁদ বর্মন, গ্রামঃ সদ্দারপাড়া, তিনি বলেন, আমার বিয়ের পর পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল ১০ জন। শ্বশুরের জমি ছিল চার বিঘা। এই জমী দিয়ে সংসার চলতো না। আমার শশুর শুন্য হাতে পৃথক করে দেয়। পৃথক করে দেওয়ার পর আমার পরিবারে সদস্য হয় পাঁচজন। আমি আমার স্বামী, দুই মেয়ে এক ছেলে। আমার স্বামী মানুষের বাড়িতে কাজ করতে। আমি মানুষের বাড়ি থেকে ধান এনে মুড়ি ভেজে দিয়ে যা মুড়ি পাই তা আমার স্বামী বাজারে বিক্রি করে চাল নিয়ে আসতো। তা থেকে সংসার চালাতে হতো। টাকার অভাবে বড় ছেলে মেয়েকে লেখাপড়া করাতে পারিনি। ছেলে যখন ৫ শ্রেণীতে পড়ে তখন তাকে স্বনকারের কাজ শেখানোর জন্য একটি স্বনকারের দোকানে রেখে দিই।

সে কাজের পাশাপাশী লেখাপড়া চালিয়ে যায়, এবং এসএসসি পাশ করে। কাজ করে যে আয় করতো সে তা থেকে কিছু টাকা প্রতি মাসে জমিয়ে এখন সে নিজেই একটি স্বণকারের দোকান দেয়। এবং সে দোকানটি এখন খুব ভাল চলে। আমার ছেলে এখন লাখপতি। আমি পুষ্টির কাজ করে যা আয় করেছিলাম, তা দিয়ে মুরগ্রির ফার্ম করেছি। এতে অনেক টাকা আয় করেছিলাম। এবং ব্র্যাক থেকে সেবিকার কাজ করে, ওষুধ ক্রয় করে গ্রামে বিক্রি করতাম। এভাবেই অতি কষ্টে চলতো আমাদের সংসার। ্এরপর হাঙ্গার ফ্রি ওয়াল্ড থেকে দোকান করার জন্য ৩৫০০/- টাকার অনুদান পেয়ে একটি দোকান দিয়েছিলাম। দোকানের আয় দিয়ে একটি ছাগল ক্রয় করি। এ ছাগলটি বড় করে ২ বছর পর ১০,০০০/- টাকা বিক্রি করি। এ টাকার সাথে আরও কিছু টাকা দিয়ে আধাবিঘা জমি বর্গা নিয়েছি। সেই জমির ফসল দিয়ে সংসার চলতো।

এরপর বি আরডিবি,তে প্রথমে ২ টাকা করে সঞ্চয় জমা করি। তখন এ দুই টাকায় জমা করা কষ্টকর ছিল, তখন প্রথমে ২,০০০/- টাকা ঋন দিই। ডিপিএস খোলা ১০০/- টাকা দিয়ে পাঁচ বছরের জন্যও বড় মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য ১ বিঘা জমি বর্গা হিসেবে দেওয়া হয়। ১০,০০০ টাকায় ৫ বছর পর ডিপিএস ভেঙ্গে জমিটি ফেরত নেওয়া হয়। ছোট মেয়েকে আমার ছেলে স্বণকারের দোকান থেকে যে বেতন পায় তা দিয়ে লেখাপড়া ও কাপড় চোপড় কেনা হত।

ছোট মেয়ে লেখাপড়া শিখে মানুষের মত মানুষ হয়ে একটি সরকারী নার্স হিসেবে কাজ করছে পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে, আগে ছিল মাটির ঘর ও ফুসের ঘর আর টিনের চালা, এখন পাকা ঘর দিয়েছি নিজের ৫ বিঘা জমি ক্রয় করেছি। আমার বাবা একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা ছিলেন আর আমি এক মাত্র সন্তান আমার বাবা বেতনভুক্তী হতে পারেননি। কিন্তু পরে তা সম্ভব হয়েছিল, যুদ্ধে আমার বাবা মৃত্যু বরন করেছিলেন। সেই বেতনের উত্তরাধিকারী হওয়ায় আমি আমার বাবার বীর মুক্তিযোদ্ধার টাকা পাই, এবার আমি এক সাথে ৫২,০০০/- টাকা পেয়েছিলাম। এখন ব্যাংকে ১ লাখ টাকা আছে। ব্র্যাকের সহযোগীতায় নিজের উন্নয়নের পাশাপাশি এলাকার মানুষের জন্য পুষ্ঠি ও স্বাস্থ্য বিষয়ক কাজ করেছি। হাঙ্গার ফ্রি ওয়াল্ডের সহযোগিতায় নারী উন্নয়ন ও পুজীগঠন সহ নারীদের সচেতনতা মুলক বিভিন্ন কাজ করেছি। এখন ঈশ্বরের কৃপায় এবং আপদের আর্শিবাদে আমার পরিবার ভালোই চলে, কিন্তু হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের কথা কোনদিনই ভুলতে পারবনা। এখন অমার পরিবার অনেক সুখি।

নির্যাতনের বিভিশিক্ষা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করেন যে নারী মোছাঃ রুপনা বেগম, পিতা-মৃত: শাসমুল হক, মাতাঃ জুলেখা বেগম, গ্রামঃ জমাদারপাতা, তিনি বলেন, ২০০২ সালে এস,এস,সি পাশের পরে পরিবারের সম্মতি নিয়ে বিয়ে হয় আমার। পরিবারে বাবা-মা যদিও মেয়ে বিয়ে দিয়ে চিন্তামুক্ত ছিলেন তা নয়, বেড়ে গেল পরিবারের হাহাকার কান্না। সেই কান্নার কারণ হল যৌতুক। যৌতুকের দায় মাথায় নিয়ে শ্বশুর বাড়ীতে টিউশনি করতাম এভাবে এইচ,এসসি পাশ করেছি, তবু যৌতুক প্রধা রোধ করতে পারিনি। এমনকি স্বামীর সাথে ঢাকা গার্মেন্সে চাকুরি করেও সঠিক ভাবে নিজের ঠাই করতে পারিনি।

এর পরে তার ওরশে জন্ম হল একটি কন্যা সন্তান। কিন্তু নির্যাতন কমেনি বেড়েই চলেছে। এভাবে নির্যাতনের মধ্য দিয়ে প্রায় ১০টি বছর সংসার জীবন শেষ হল শত কষ্টের মধ্য। নিজের লেখাপড়া থেকে দুরে থাকিনি চালিয়ে গেছি ২০১০ সালে বিএসএস (স্বাতক) ডিগ্রী পাশ করি। কিন্তু চাকুরী পাওয়া স্বত্বেও সেই সুযোগ হারিয়ে ফেলেছি মানসিক চাপের কারণে। এর মাধে কন্যা সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে টিউশনি পড়াতাম। এক সময় শ্বশুর বাড়ীর লোকজন ও আমার স্বামী যৌতুক ছাড়া আমাকে নিয়ে যাবেনা বলে জানান। অবশেষে আমার তালাক নামা পাঠিয়ে দেয়। আমি আইন ব্যবস্থা নিলে কিছুদিন মামলা চলাকালে পরে সেটি ব্রাক আইন ব্যবস্থার সহায়তা মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি হয়। বর্তমানে কন্যা সন্তান নিয়ে মায়ের বাড়িতে অবস্থান করছি। আমার মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী। আমি বর্তমানে টিউশনী করে সংবার চালাই।

অর্থনেতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী মোছাঃ শান্তনা আক্তার, পিতাঃ মোঃ আব্দুর করিম মজুমদার, মাতাঃ মোছাঃ রোকেয়া বেগম, গ্রামঃ কান্তমনি, তিনি বলেন, ২০১২ সালে আমি স্বামির কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাই তখন আমি আমার বাবার বাসায় থাকি। আমার বাবার ছয় মেয়ের মধ্যে আমি ৩য়। আমার বাবা একজন দিন মজুর। দিনে আনে দিনে খায়। বাড়ির ভিটে ছাড়া আমার বাবার কোন জমি নেই। অনেক কষ্ট করে আমাদের মানুষ করেছেন। শত কষ্টের মাঝে আমার বাবা ছয় মেয়েকে কোন রকম লেখা-পড়া করে বিয়ে দিয়েছেন। এই অভাব অনটনের মধ্যে আবার আমি আমার বাবার সংসারে গিয়ে পরলাম। আমার শেষ সম্বল একজোড়া স্বর্ণের বালা ছিল, সেগুলো বিক্রি করে আমি ১.৩৩ শতাংক জমি মানুষের কাছে লিজ নিই। উক্ত জমিতে আমি নিজে চাষাবাদ শুরু করি। চার মাস পরে আমার লিজ নেওয়া জমি থেকে ২০.০০০/- টাকা আয় করি।

প্রথম বার এক ফসলের জন্য লিজ নিয়েছিলাম পরবর্তীতে আমার আয়ের টাকা দিয়ে সেই জমি ২ বছরের জন্য লিজ নিই। আমি নিজে পরিশ্রম করে ফসল ফলাই। ২০১৫ সালের মধ্যে আমার মোট টাকার পরিমাণ হলো ১.৮০.০০০/- টাকা। তারপর জমির দাম বাড়িয়ে দেওয়াতে আমার কাছ থেকে জমি ফিরে নেয়। ২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আমি সমবায়ের আওতায় সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির গ্রাম কর্মী ছিলাম। সেখান থেকেও আমি লাভবান হতে পেড়েছি। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সর্দারপাড়া বোদায় ৪ শতক জমি ক্রয় করি। যার মূল্য ২.৪৫০০০/-টাকা। মেয়েদের বিয়ের পর বাবার বাসায় থাকা ঠিক নয় তাই আমি বাবার বাসা থেকে একটি বিউটি পার্লারের কাজ শুরু করলাম।

তার পরে আমার সর্দার পাড়া ক্রয় কৃত ৪ শতক জমিতে টিনসেট ঘর উঠালাম এবং বসবাসের উপযোগী করে তুললাম। আমার মেয়েকে নিয়ে নিজের বাসায় উঠলাম টিনসেড ঘড় উঠালাম এবং বসবাসের উপযোগী করে তুললাম। আমার মেয়েকে নিয়ে নিজের বাসায় উঠলাম। পাড়া প্রতিবেশী তখন বলতে শুরু করল স্বামী ব্যাথিত এখানে থাকা যাবে না। দীঘ পাঁচ বছর পর আমি সিদ্ধান্তে উপনিত হই যে, আমার সন্তানের বাবাকে বিয়ে করব এবং করলাম। এখন আমি আমার স্বামী সন্তান নিয়ে পরিশ্রমের ক্রয় করা জমিতে বসবাস করছি। আমার এই সাফল্যের পিছনে আমার স্বামীর কোন অবদান নেই।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য