বসন্ত ঋতু আসলেই গাছে গাছে নতুন ফুলের সমারোহ প্রকৃতি প্রিয় মানুষের দৃষ্টি কারে। শিমুল, পলাশে শোভায় প্রকৃতি নিজেকে নতুন রুপে প্রকাশ করে। আদিবাসী সাঁওতালরাও বসন্তকে বরণ করে নেয় তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য দিয়ে। এসময় সাঁওতাল তরুনীরা নতুন নতুন ফুল তাদের খোঁপায় গেঁথে আনন্দে নাচে-গানে মেতে ওঠে। সাঁওতাল গ্রামে গ্রামে চলে আনন্দ উৎসব। বাড়ি বাড়ি তৈরি হয় হাঁড়িয়া। সবাই হাঁড়িয়া খেয়ে আনন্দে বিভোর হয়ে মাদলের তালে তালে গাইতে থাকে, নাচতে থাকে। আর সেই আনন্দ-উৎসবের নাম ‘‘বাহা উৎসব’’।

আদিবাসী সাঁওতালদের অন্যতম একটি প্রধান পার্বণ হচ্ছে ‘‘বাহা উৎসব’’ বা বাহা পরব। বাহা অর্থ ফুল। তাই বাংলায় বাহা পরবকে ‘‘ফুল উৎসব’’ বলা হয়। মূলত, নববর্ষ হিসেবে ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব পালন করে সমতলে বসবাসকারী আদিবাসী-সাঁওতালরা। উত্তরাঞ্চলে সমতলে বসবাসকারী আদিবাসী জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে উড়াও, মুন্ডা, মালো, মাহাতো, মালপাহাড়ী, রাজওয়ারসীসহ মোট ৩৮ টি ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী এই বাহা উৎসব পালন করে থাকে।

বাহা পরবের মূল কথা হচ্ছে এই পরব না করা পর্যন্ত সাঁওতাল মেয়েরা সারজম বাহা (শাল ফুল), ইচাক বাহা, মুরুপ বাহা এগুলো খোঁপায় দিতে পারেনা। এই পরবের মধ্য দিয়েই নতুন বছরের ফুল, ফল, পাতাকে সাঁওতাল আদিবাসীরা ব্যবহার করতে শুরু করে।

১৫ মার্চ বৃহস্পতিবার ও ১৬ মার্চ শুক্রবার জাতীয় আদিবাসী পরিষদ এর পৃষ্ঠপোষকতায় ও বাহা উৎসব উদযাপন কমিটি এবং আদিবাসী সাংস্কৃতিক পরিষদ এর আয়োজনে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার আদিবাসী পল্লীর বারকোনা ফুটবল মাঠে দুই দিনব্যাপী ‘‘বাহা উৎসব ১৪২৪’’ উদযাপন করা হয়। সহযোগিতায় ছিলেন বারকোনা মৗঞ্জহি পরিষদ, গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র, এনএনএমসি, ইএসডিও, এএলআরডি, সেড, কাপেং ফাউন্ডেশন।

দিনভর ধর্মীয় পুজা-অর্চনা ও ভারতের সাঁওতালি সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও সঙ্গীত শিল্পী বীরবাহা হাঁসদা, ভাবিনী বাস্কে, পুষ্পলতা বাস্কি ও লাংতিতি কিস্কু’র মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুই দিন ব্যাপী বাহা উৎসব পালন করেন উত্তারঞ্চলের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ ও শিশু সাঁওতাল আদিবাসীরা। এসময় বিভিন্ন বর্ণের আদিবাসীদের আগমনে মিলন মেলায় পরিনত হয় বারকোনার ফুটবল মাঠ।

বাহা পরব ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে হয়ে থাকে। গ্রামের মানঝি (গ্রাম প্রধান) পরবের দিন ঠিক করে। দুই-তিন দিনব্যাপি চলতে থাকে পরব। বাহা পরবের জন্য নির্দিষ্ট একটি পূজার স্থান থাকে। একে সাঁওতালরা জাহের থান বলে। তিনটি ছোট ছোট খড়ের ঘর দিয়ে জাহের থান তৈরি হয়। গ্রামের নাইকে অর্থাৎ পুরোহিত পরিস্কার ধুতি পড়ে পূজা থানে যান। নাইকের হাতে কাঁসার থালাতে থাকে নতুন নতুন ফুল। এসময় সাঁওতাল তিন দেবতা জাহের এঁরা (ফুলের দেবী), মারাঙবুরু (সাঁওতাল দেবতা প্রধান), পারগানা বঙ্গা (এলাকার দেবতা) এর পুজা করেন নাইকে।

গ্রামের নাইকে অর্থাৎ পুরোহিত গণেশ বেসরা বলেন, সাঁওতালদের বেশ কয়েকজন দেবতা রয়েছে যাদের মধ্যে জাহের এঁরা (ফুলের দেবী), মারাঙবুরু (সাঁওতাল দেবতা প্রধান), পারগানা বঙ্গা (এলাকার দেবতা)। এই দেবতা বাড়ীতেও থাকে বাড়ীর বাইরেও থেকে ডিউটি দেয়। আমরা বিশ্বাস করি। এজন্য এই দেবতাদেরকে আমরা এই মাসে নতুন শাল ফুল দিয়ে পুজা দেই। আর পুজা দেয়ার পরেই আমরা নতুন ফুল, ফল ছিড়ি। বাহা পুজার উদ্দ্যেশ্য হচ্ছে যে, আমরা যেন আজ থেকে সারা বছর ভালা ভাবে চলতে পারি। আমাদের যেন কোন অমঙ্গল না হয়, কষ্ট না হয় আর এই আনন্দ যেন সারা বছর সবার সাথে একই রকম থাকে।

বাহা উৎসব সম্পর্কে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, বাহা পরব বা উৎসব সমতলের সবচেয়ে সংখ্যাদিখ্য আদিবাসী জাতি সাঁওতালদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব। বাহা মানে ফুল। ফুল উৎসব যতক্ষন না আদিবাসীরা করতে পারেন ততক্ষন পর্যন্ত আদিবাসীর সমাজে নতুন ফুল ব্যবহার করা হয় না। আর মেয়েরাও তাদের খোপায়-মাথায় এই ফুল দিতে পারবে না। এ দেশের প্রকৃতির সাথে আদিবাসী সমাজ মিশে আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যেভাবে প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে, যেভাবে বনজঙ্গল উজাড় হয়ে যাচ্ছে এবং আদিবাসীরা যেই জায়গা থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে। সাঁওতালসহ অন্যান্য আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী এসব সংস্কৃতি আগের সেই জৌলুস হারাতে চলেছে। আর সেই কারনে অনেক সাওতাল আদিবাসীরা এই উৎসব পালন করতে পারছে না। এভাবে আদিবাসী সংস্কতি ধ্বংস হতে থাকলে আদিবাসীরাও একদিন হারিয়ে যাবে। তাই তাদের বাঁচিয়ে রাখতে ও তাদের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতেই এই বাহা উৎসব পালন করে থাকেন আদিবাসীরা। আর শুধু মাত্র সাওতালরাই নয় উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী জাতি গোষ্ঠীর উড়াও, মুন্ডা, মালো, মাহাতো, মালপাহাড়ী, রাজওয়ারসীসহ মোট ৩৮ টি জাতি গোষ্ঠী এই বাহা উৎসব পালন করে থাকে। তাই আমরা জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও জাতীয় নারী আদিবাসী পরিষদ, আদিবাসী সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুব পরিষদসহ উত্তরবঙ্গের সংগঠন মিলে আমরা চেষ্টা করছি আদিবাসীদের সংস্কৃতি, রীতিনীতি, পালা-পরব যাতে নষ্ট বা হারিয়ে না যায়। এই বাহা উৎসবের মাধ্যমে আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে এই বার্তা পৌছে দিতে চাই যে, সংস্কৃতি হচ্ছে আদিবাসীদের পরিচয়। প্রতিবছর যেন আমরা এই বাহা, সহরাই, আরো যেই যেই পরব আছে আদিবাসীদের সেগুলো যেন আমরা পালন করি এবং প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় যেন এই উৎসব পালন করা হয়।

আদিবাসী সাংস্কৃতিক পরিষদ ও উদযাপন কমিটির আহবায়ক বাসন্তি মুরমু বলেন, আমরা প্রকৃতিকে ভালোবেসে সাওতাল আদিবাসীরা বাহা উৎসব পালন করি। এই বাহা উৎসবের পুজা পার্বন করলে আমাদের সমাজ ও পরিবারের উন্নয়ন হবে। বাহা পুজা না করা পর্যন্ত আমাদের আদিবাসী সাওতাল নারীরা বাহা ফুল অর্থাৎ শাল ফুল ছিড়েও না মাথায় পরেও না। বছরের শুরুতে যেই নতুন ফুল ফুটে বা যেই এলাকায় যেই ফুল পাওয়া যায় সেই ফুল দিয়েই এই বাহা উৎসব পালন করা হয়। আর নতুন প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকে শিখবে ও দেখবে এবং যাতে ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্যবাহী বাহা পরব নষ্ট না হয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখবে।

এলাকাবাসী কয়েকজন বলেন, আমাদের দাদার এবং জেঠার কাছ থেকে শুনেছি আমরা নাকি আদিকালে বনে বাস করতাম। বনই নাকি ছিল আমাদের জীবন। বনই আমাদেরকে লালন করতো। বনের অনেক গাছ থেকে খাদ্য সৃস্টি হতো। সেই গাছকে দেবতা মনে করে আর জীবনকে যেন রক্ষা করে সেই জন্যই আমরা বাহা উৎসব করি।

আদিবাসী শিক্ষার্থী বলেন, আমরা শাড়ি পরে নৃত্য পরিবেশন করতে এসেছি। আর আমরা চাই নৃত্য দিয়েই যেন এই বাহা উৎসব টি ভালোভাবে পালিত হয়।

বাহা উৎসব দেখতে আসা দর্শনার্থী সাহেব হাসদা ও গোলাপী হেমরম জানান, আমরা চাই যেন প্রত্যেক এলাকায় আর প্রতি বছর যেন এই বাহা উৎসব হয়। যাতে আমরা সাওতাল আদিবাসীরা এই কৃষ্টি কালচারকে ধরে রাখতে পারি।

এর আগে বাহা উৎসবের প্রথম দিন সকাল ৮ টায় ছিল বাহা উম। পরে সকাল ১১ টায় বাহা উৎসবের উদ্বোধন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবের উদ্বোধন করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী এ্যাড. মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার এমপি। এসময় পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তরফদার মাহমুদুর রহমান, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি হাফিজুর ইসলাম প্রামানিক, সাধারন সম্পাদক রেজাউল করিম, পার্বতীপুর ইয়ংস্টার ক্লাবের সভাপতি আমজাদ হোসেন, দিনাজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির-২ পার্বতীপুর জোনাল অফিসের জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মজিবুল হক, পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুল হক প্রধান, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন ও তার স্ত্রী উদযাপন কমিটির আহবায়ক বাসন্তি মুরমু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বাহা উৎসবের দ্বিতীয় দিনে সকাল ৮ টায় পালিত হয় বাহা সীরদি। সকাল ১১টায় বাহা পরবের তাৎপর্য বিষয়ক আলোচনা করেন দুলাল সাধু, মতিরাম সাধু, সাধু রবি সরেন। পরে বিকেলে সমাপনী আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিথ ছিলেন আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস এর আহবায়ক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন বীরগঞ্জ-কাহারোল আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল, দিনাজপুর নাট্য সমিতির সভাপতি চিত্ত ঘোষ, উদীচী জেলা সংসদের সভাপতি রেজাউর রহমান রেজু।

পরে বেলা ৩টায় পরে স্থানীয় আদিবাসী শিল্পীদের পাশাপাশি ভারতের সাঁওতালি সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও সঙ্গীত শিল্পীবৃন্দ সঙ্গীত পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য