আজিজুল ইসলাম বারী, লালমনিরহাট থেকে: লালমনিরহাট ১০০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবল সংকটের পাশাপাশি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। নাজুক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অপরিষ্কার টয়লেটের কারণে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোয় দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে রোগী ও স্বজনরা। চিকিৎসক, কর্মচারী যারা আছেন, তারা ঠিকমতো সেবা দেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে মঞ্জুরীকৃত জনবলের মধ্যে ১৮ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ২০ জন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা। কিন্তু আছেন মাত্র ১২ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও চারজন মেডিকেল অফিসার। ৬৫ জন নার্সের স্থলে কর্মরত ৫৩ জন।

পাঁচজন সহকারী নার্সের স্থলে একজনও নেই। নার্স সেবা তত্ত্বাবধায়ক, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি), হিসাবরক্ষক পদে কেউ নেই। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) পদে একজন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিও) পদে একজন, হেলথ এডুকেটর পদে একজন, স্ট্রেচার বেয়ারার পদে একজন থাকলেও বাকি একটি করে পদ দীর্ঘদিন ধরেই খালি। তিনজন ফার্মাসিস্ট থাকার কথা থাকলেও আছেন একজন।

উচ্চমান সহকারী, লিলেন কিপার, স্টেরিলাইজার কাম মেকানিক, ইনস্ট্রুমেন্ট কেয়ারটেকার, ওয়ার্ড বয় পদে একজন করে থাকার কথা, কিন্তু নেই। তিনজন কুকের বিপরীতে আছেন দুজন ও ১০ জন অফিস সহায়কের স্থলে কর্মরত নয়জন। তবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চারটি পদই পূর্ণ।

সম্প্রতি হাসপাতালে গিয়ে প্রসূতি ও গাইনি বিভাগে ভর্তি থাকা লালমনিরহাট পৌরসভার আপনপাড়া এলাকার রুজিনা বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালে কি দুর্গন্ধ আপনি নিজেই দেখেন। টয়লেটে যাওয়ার উপায় নেই। আমরা গরিব মানুষ, টাকা থাকলে কি আর এখানে আসি! গন্ধে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা। হাজীগঞ্জ এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মমতাজ বেগমেরও একই অভিযোগ। আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়নের খাতাপাড়া এলাকার জোসনা বেগম বলেন, এত গন্ধ, টয়লেটে ১ মিনিট থাকার উপায় নেই। গা বাঁচিয়ে কাজ সারতে হয়।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায় রোগীদের ওয়ার্ড, টয়লেট, বিছানা ও চত্বর নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করায় উত্কট গন্ধ ছড়াচ্ছে। চারজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকার পরও কেন এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, এ প্রশ্নে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, এত বড় একটি হাসপাতালের জন্য চারজন সুইপার যথেষ্ট নয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

একজন মেডিকেল অফিসার (চিকিৎসক) বলেন, সিনিয়র কনসালট্যান্ট মেডিসিন, ইএনটি, গাইনি, সার্জারি, শিশু, কার্ডিওলজি, অ্যানেস্থেশিয়া; জুনিয়র কনসালট্যান্ট সার্জারি, শিশু, চক্ষু, রেডিওলজি, অ্যানেস্থেশিয়া, অর্থোসার্জারি ও প্যাথলজি পদের অধিকাংশ খালি। জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদে চারজন থাকার কথা কিন্তু আছে মাত্র একজন। এভাবে একটি হাসপাতাল চলতে পারে না। তিনি অভিযোগ করেন, যে কজন চিকিৎসক আছেন, তারাও যখন ইচ্ছা তখন আসেন, যখন খুশি চলে যান। এসব দেখার যেন কেউ নেই।

তবে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুল ফাত্তাহ মো. আহসান আলী এসব অভিযোগ মানতে নারাজ। তিনি বলেন, আঙুলের চাপের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে কর্মরতদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। এ পদ্ধতিতে কেউ অনুপস্থিত থাকতে পারে না।

চিকিৎসক সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার কথা স্বীকার করে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মঞ্জুর মোর্শেদ দোলন বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকা এবং নানা সংকটের কারণে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর পরও সীমিত জনবল দিয়েই প্রত্যাশিত সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। তবে এভাবে বেশি দিন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জনবল সংকটের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক আহসান আলী বলেন, মঞ্জুরীকৃত পদের বিপরীতে জনবল চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসক সংকট থাকায় বিশেষ করে দরিদ্র মানুষকে প্রত্যাশিত সেবা দেয়া কষ্টসাধ্য হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগে বিষয়টি জানানো হয়েছে, শিগগিরই একটা সমাধান আসবে বলে আশা করছেন লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য