ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারের চারটি লোকসভা আসনের উপনির্বাচনে তিনটিতেই হেরেছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রার্থীরা।

এর মধ্যে উত্তর প্রদেশে তারা হারিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ও উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্যর ছেড়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ দুটি আসন।

অখিলেশ যাদবের নেতৃত্বাধীন সমাজবাদী পার্টির প্রার্থীরা দুই আসনেই বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বলে খবর এনডিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়ার।

বিহারের একটি আসন ধরে রাখতে পারলেও আরারিয়ার লোকসভায় বিজেপি হেরেছে লালু প্রসাদের রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) প্রার্থীর কাছে; আরজেডি জেহানাবাদের বিধানসভার আসনেও জয়ী হয়েছে।

বুধবার উত্তর প্রদেশের দুটি এবং বিহারের আরারিয়া আসনের ভোট গণনার শুরু থেকেই বিজেপি প্রার্থীদের পরাজয়ের লক্ষণ স্পষ্ট হতে থাকে।

মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টি উপনির্বাচনে অখিলেশের সমাজবাদী পার্টির প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছিল। বিজেপির জয়যাত্রা ঠেকাতে একসময়ের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এ দুই দল একত্রিত হয়; লোকসভায় সমাজবাদী পার্টিকে সমর্থনের বিনিময়ে চলতি মাসের শেষে হতে যাওয়া রাজ্যসভার নির্বাচনে মায়াবতীর দলের প্রার্থীরা অখিলেশের সমর্থন পাবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, গোরখপুরের আসনটি বিজেপির জন্য বেশ মর্যাদাপূর্ণ আসন ছিল। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এ আসন থেকে টানা পাঁচবার বিজয়ী হয়েছিলেন।

এবারের উপনির্বাচনেও দলের প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যোগী। অংশ নিয়েছিলেন বেশকটি শোভাযাত্রা ও রোড শোতে। এ উপনির্বাচনকে ২০১৯ এর সংসদ নির্বাচনের ‘ড্রেস রিহার্সাল’ অ্যাখ্যা দিয়ে দলের প্রার্থীদের ২০১৪-র মতো বিপুল ব্যবধানে জয়ী করতে সমর্থকদের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছিলেন কট্টর হিন্দুত্ববাদী এ নেতা।

ফল গণনার পর যোগী বলেছেন, তারা মায়াবতী ও অখিলেশের ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস’কেই পরাজয়ের কারণ অভিহিত করে তিনি জানান, হারের কারণ অনুসন্ধান করে পরের নির্বাচনের জন্য নতুন কৌশল নেওয়া হবে।

২০১৪ সালের নির্বাচনে ফুলপুরের আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন কেশব প্রসাদ মৌর্য; উপমুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তার ছেড়ে দেওয়া আসনও খুইয়েছে বিজেপি।

উত্তর প্রদেশের উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের এ পরাজয় ভারতের রাজনীতেতে বিজেপিবিরোধী মেরুকরণে নতুন হাওয়া দেবে বলে মনে করছে এনডিটিভি। সাধারণ নির্বাচনের বছরখানেক আগে ভোটের এ ফল কেন্দ্রে ক্ষমতাসীনদের কপালে ভাঁজের সংখ্যা বাড়িয়ে দেবে বলে ধারণা পর্যবেক্ষকদেরও।

“উত্তর প্রদেশের নির্বাচনের ফল সবসময়ই বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। যেখানে এবারের আসন দুটি ছিল মুখ্যমন্ত্রী ও উপমুখ্যমন্ত্রীর; এখানেই জনরোষ এরকম, রাজ্যের বাকি এলাকাগুলোর কথা চিন্তা করুন,” জয় নিশ্চিত হওয়ার পর সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব।

এ জনরায় বিজেপিবিরোধী বৃহত্তর জোট নির্মাণে ভূমিকা রাখবে কিনা, সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ২০১৭ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বহুজন সমাজবাদী পার্টি ও সমাজবাদী পার্টি একত্রিত হতে পারলে ‘বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারত না’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এনডিটিভি বলছে, টানা তিন দশক পর গোরখপুর আসনে গোরখনাথ মন্দিরের আধিপত্যে হানা দিলেন সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী প্রভিন কুমার নিশাদ। যোগীর পাঁচবারের আগে এ আসনে টানা তিনবার জিতেছিলেন তার গুরু মহন্ত আভেদ্যনাথ। সমাজবাদী পার্টির নগেন্দ্র প্রতাপ জয়ী হন ফুলপুর আসনে।

বিহারের আরারিয়া আসনে আরজেডির বিজয়কে মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমারের প্রতি অনাস্থা হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। লালু প্রসাদের দল ও কংগ্রেসের সঙ্গে বৃহত্তর জোটে থাকার পরও গত বছর নীতিশের জনতা দল (জেডি ইউনাইটেড) বিজেপিকে সঙ্গে নিয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় আসীন হয়।

আরজেডি পরে একে বিশ্বাসঘাতকরা হিসেবে অভিহিত করে বলেছিল, ২০১৫ সালের নির্বাচনে ভোটাররা আরজেডি,কংগ্রেস ও জেডি ইউনাইটেডের বৃহত্তর জোটকে পছন্দ করেছিল; নীতিশ ভোটারদের ওই সিদ্ধান্তে পেছন থেকে ছুরি মেরে ক্ষমতায় বসেছে।

অন্যদিকে নীতিশের দাবি ছিল, রাজ্যের উন্নয়নেই বিজেপিকে অংশীদার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি।

দুর্নীতির দায়ে লালু প্রসাদ যাদব জেলে থাকায় তার ছেলে তেজস্বী যাদব বিহারের লোকসভা আসনের উপনির্বাচনের প্রচারণায় নেতৃত্ব দেন; এবারের নির্বাচনকে তেজস্বীর নেতৃত্বগুণের পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছিল বলে ভাষ্য গণমাধ্যমগুলোর, তাতে সফলভাবেই উৎরে গেলেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য