দিনাজপুর সংবাদাতাঃ “নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে প্রধান শর্ত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর সমঅংশগ্রহণ ও সমঅংশীদারিত্ব: জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে চাই সরাসরি নির্বাচন” এই লক্ষকে সামনে রেখে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দিনাজপুর জেলা শাখার উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

১১ মার্চ রোববার দিনাজপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দিনাজপুর জেলা শাখার সভাপতি কানিজ রহমান এর সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড. মারুফা বেগম। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আর্ন্তজাতিক নারী দিবস, নারীর সার্বিক ক্ষমতায়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবছর নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন আসন সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি ও নিবার্চনী এলাকা পূর্ণঃনির্ধারণ এবং রাজনৈতিক দলের সকল পর্যায়ে নীতি নির্ধারণের ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ।

এই লক্ষ্যে ১লা মার্চ থেকে ৮মার্চ আর্ন্তজাতিক নারী দিবসে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সপ্তাহ পালন করেছে বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে। “জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নিবার্চন, আসন সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি ও নির্বাচনী এলাকা পূর্ণঃনির্ধারণ করতে হবে” এই শ্লোগান সামনে রেখে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হয়। কর্মসূচীগুলো হলো সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সাথে মানববন্ধন, রাজনৈতিক দলের সাথে মত-বিনিময় সভা, সুশীল সমাজের সাথে মত-বিনিময় সভা, সমাবেশ ও সাংবাদিক সম্মেলন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন। যদিও জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন ১৯৪৮ সালে ঘোষণা করে ”সকল মানব সন্তান জন্মসূত্রে স্বাধীন ও সমমর্যাদার অধিকারী এবং এই অধিকার অবিভাজ্য”। এই ঘোষণার পরও নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ দূর্গম। বাংলাদেশে সম্পদ-সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সিডও সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন নারী আন্দোলনের সুদীর্ঘ দিনের দাবি।

একটি গণতান্ত্রিক, নারী-পুরুষ সমতাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই মহান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সংবিধান আমরা পেয়েছি তার ৭,১০,১৭,২৭,২৮ নং অনুচ্ছেদের বিভিন্ন ধারা- উপধারায় বর্ণিত আছে তৃণমূল থেকে জাতীয় সংসদ সর্বস্তরেই নারীর সম অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। সেই লক্ষ্যে দেশ গঠনে সর্বস্তরে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে নারীদের অধিকতর সম্পৃক্ত করা, রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর সক্রিয়তা বৃদ্ধি, এক কথায় নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দীর্ঘ প্রায় ২ দশকের অধিক সময় ধরে দাবি জানিয়ে আসছে-জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি করে এই আসনসমূহে সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়া চালু করার জন্য। জাতীয় সংসদে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের দেশবাসী ও দেশের বৃহত্তর নারীসমাজের কাছে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এই পদ্ধতি অপরির্হায বিষয়। ১৯৭৩ সাল থেকেই জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বৃদ্ধি ও সরাসরি নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে একক ও ঐক্যবদ্ধ নারী আন্দোলনের মাধ্যমে। দেশের বৃহত্তর নারীসমাজের পক্ষে কার্যকর গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হলে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিকল্প নাই বলে আমরা মনে করি।

রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর সমঅংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে কার্যকর ফলপ্রসু অংশগ্রহনের লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের নারী আন্দোলন দাবী এবং বাস্তব চাহিদা থাকা সত্বেও জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সরাসরি নিবার্চনে বিধান রাখা হয়নি। উপরন্তু মনোনীত আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে-যা কিনা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কোন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে অপারগ।

বাস্তব অভিজ্ঞায় দেখা যায় যে, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের মাধ্যমে নিবার্চিত নারী সদস্যদের একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা না থাকায় মনোনীত নারী সংসদ সদস্যগণ যে ধরনের বাস্তব সমস্যা ও জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন, এতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রকৃত প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। যদিও ক্ষমতার কাঠামোতে নারীর অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ গুরুত্বর্পূণ অবস্থানে আছে।

স্পিকার হিসেবে একজন নারীকে নির্বাচন, মন্ত্রী পরিষদে নারীর অর্ন্তভূক্তি, বিভিন্ন সংসদীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীর অবস্থান আর্ন্তজাতিক মহলে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এইসব পদক্ষেপ গ্রহণ না করে ব্যক্তি ইচ্ছা বা দলীয় ইচ্ছায় এই ধরনের গৃহীত পদক্ষেপ স্থায়ী হবে না শুধু প্রতীকি অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন নয়, স্থায়ীত্ব নিশ্চিত করতে প্রয়োজন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুসরণ।

রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা রাজনৈতিক দলের নীতি নির্ধারনীর সকল পযার্য়ে এক তৃতীয়াংশ নারী নেতৃত্ব, নির্বাচনী এক তৃতীয়াংশ আসনে নারীর প্রার্থীর মনোনায়ন প্রদান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে প্রতিযোগীতামূলক মনোনায়ন প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরন এই সবই নারীর ক্ষমতায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকার, রাজনৈতিক দল, নিবার্চন কমিশন সকলকেই এব্যাপারে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহ-সভাপতি অর্চনা অধিকারী, মিনতি ঘোষ, সহ-সাধারণ সম্পাদক মনোয়ারা সানু, সাংগঠনিক সম্পাদক রুবিনা আক্তার, আন্দোলন সম্পাদিকা গৌরী চক্রবর্তী, অর্থ সম্পাদক রত্মা মিত্র প্রমুখ।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য