ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে শুক্রবার মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতের নাম মোহাম্মদ জেইন আল জাবারি। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্পের ঘোষণার পর থেকে এ নিয়ে নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা ২৭ জনে দাঁড়ালো। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে আল জাজিরা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার পর এর প্রতিবাদে রাজপথে নামে ফিলিস্তিনিরা। তৃতীয় ইন্তিফাদা বা সর্বাত্মক প্রতিরোধের ডাক দেয় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। শুক্রবারও ট্রাম্পের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে ফিলিস্তিনিরা। ২৪ বছরের মোহাম্মদ জেইন আল জাবারিও এতে অংশ নেন। এক পর্যায়ে ইসরায়েলি বাহিনীর ছোড়া একটি গুলি এসে তার বুকে বিদ্ধ হয়। হানাদার বাহিনীর বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত জাবারিকে হেবরনের সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিহতের চাচা আবু নাসের আল জাজিরাকে জানান, তার ভাতিজা মানসিক প্রতিবন্ধী ছিল। এছাড়া তার উচ্চারণেও সমস্যা ছিল।

নিহত মোহাম্মদ জেইন আল জাবারি পেশায় একজন নির্মাণকর্মী ছিলেন। তার চার বছরের এক শিশু সন্তান রয়েছে।

মানসিক দুর্বলতা বা অসুস্থতা সত্ত্বেও হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জাবারি’র প্রতিরোধকে গর্বের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন তার চাচা আবু নাসের। তিনি জানান, প্রায়ই ওই এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান চলাকালে সবার আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেন জাবারি।

আবু নাসের বলেন, জাবারি ফিলিস্তিনকে ভালোবাসতো। ইসরায়েলি সেনারা যখন শহরে প্রবেশ করতো তখন সে বসে থাকতো না। সে আমাদের পরিবারের গর্ব। তার মৃত্যু একটি অভিঘাত। পরিবারের জন্য এটা সহজ নয়। কিন্তু এটাই আল্লাহ তাআলা’র ইচ্ছা। ফলে আমাদের বিষণ্ন হওয়ার কিছু নেই।

ইসরায়েলি বাহিনীর একজন মুখপাত্র আল জাজিরা’কে বলেন, সংঘাতের প্রধান উস্কানিদাতাকে গুলি করেছে সেনারা। নিহতের কাছে বোমা থাকারও দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

দখলদার বাহিনীর গুলিতে নিহত জাবারি’র জানাজায় অংশ নেন শত শত মানুষ। পশ্চিম তীরের হেবরনের রাস্তায় তার মরদেহ বহন করেন সতীর্থরা। স্বাধীনতার জন্য লড়াই অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন তারা।

উল্লেখ্য, ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সংকটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো জেরুজালেম। ১৯৮০ সালে জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করেছিল ইসরায়েল। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এর সমর্থন দেয়নি। আর ফিলিস্তিনিরা চায় দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেম যেন তাদের রাজধানী হয়। এ কারণে সেখানে কোনও দেশ দূতাবাস স্থাপন করেনি। সবগুলো দূতাবাসই তেল আবিবে অবস্থিত। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতিবাদে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা উপত্যকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন ফিলিস্তিনিরা।

হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া বলেছেন, ফিলিস্তিনি জনগণ বিশেষ করে পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) শহরকে সুরক্ষা দিতেই হামাসের জন্ম। এই পবিত্র শহর নিয়ে মার্কিন ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় দুনিয়াজুড়ে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে তা ফিলিস্তিনি জাতির জন্য একটি বিরাট বিজয়। দুনিয়ার সব মুক্তিকামী মানুষ এ বিষয়ে আমাদের পাশে রয়েছে।

হামাসকে নিয়ে অবশ্য ইসরায়েল-আমেরিকার বাইরে সৌদি জোটেরও অস্বস্তি রয়েছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইতোপূর্বে হামাসকে সমর্থন দেওয়ার জন্য কাতারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর জবাবে কাতারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু আরব দেশগুলোর কাছে হামাস একটি বৈধ প্রতিরোধ আন্দোলন। আমরা হামাসকে সমর্থন করি না। আমরা ফিলিস্তিনি জনগণকে সমর্থন করি।’

প্রথম ইন্তিফাদার (গণজাগরণ) সময় থেকেই পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামাসের প্রতিরোধ জারি রয়েছে। প্রথম ইন্তিফাদার সময়ে হামাসের প্রাথমিক ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ‘ইসরায়েলকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করাটাই সংগঠনের মূল তবে ফিলিস্তিনি জনতার জাতিসত্তার বোধ জাতিরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা জোরালো করে তুলতে শুরু করার পর, সেই পরিস্থিতির সমান্তরালে বদলে যেতে থাকে হামাস। মূলত দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা আল আকসা ইন্তিফাদার সময়কালে (২০০০–২০০৫) হামাসের রাজনীতিতে এক বিশেষ রূপান্তর ঘটতে শুরু করে। এ সময়ে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতাদর্শিক অবস্থানকে ছাপিয়ে যায় ফিলিস্তিনের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য